বহুমূখী সংকটে দেশের পোশাক শিল্প

জান্নাতুল সাদিয়া 

প্রকাশ: ২০:০৩, ২০ জানুয়ারি ২০২৬

বহুমূখী সংকটে দেশের পোশাক শিল্প

ছবি: সংগৃহীত

আমাদের দেশের ৪ কোটিরও বেশি মানুষের জীবন-জীবিকা পোশাক শিল্পের ওপর নির্ভরশীল, যা দেশের মোট রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮২ শতাংশ। সাম্প্রতিককালে এই খাত, তীব্র অস্থিরতা ও বহুমুখী চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন। বিশেষত, যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধি, ভারতের বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা এবং অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অস্থিরতা ,শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি এবং কারখানার নিরাপদ পরিবেশ নিয়ে চলমান বিতর্ক, অস্থিরতার মূল কারণ।এছাড়া, দেশের পোশাক শিল্প বর্তমানে বৈশ্বিক মন্দা, ক্রয়াদেশ হ্রাস, উচ্চ সুদের হার, জ্বালানি সংকট এবং আমদানি নীতি পরিবর্তনের হুমকির মতো বহুমুখী সংকটে পড়েছে, ফলস্বরূপ অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, শ্রমিক ছাঁটাই হচ্ছে এবং রপ্তানি কমে যাওয়ায় অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।এই বহুমাত্রিক সংকটের ফলে দেশের অর্থনীতিতে আরো নাজুক অবস্থায় পরবে বলে আশঙ্কা করছেন অর্থনীতিবিদ ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ।

শ্রমিকদের দীর্ঘদিনের মজুরি বৃদ্ধির দাবি, বিশেষত উচ্চ মূল্যস্ফীতির এ সময়ে, নতুন সংকট তৈরি করেছে। যদিও সর্বশেষ মজুরি কাঠামো অনুযায়ী, পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ৮,০০০ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ১২,৫০০ টাকা করা হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক সংগঠনগুলো মনে করে, এই বৃদ্ধি বর্তমান বাজার দরের তুলনায় যথেষ্ট নয়।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের তথ্য অনুযায়ী, জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে মজুরি ন্যূনতম ২২,০০০ থেকে ২৫,০০০ টাকা হওয়া উচিত। মজুরি বোর্ডের সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর যে বিক্ষোভ দেখা দিয়েছিল, তা এই শিল্পের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় উদ্বেগের কারণ। মজুরি বৃদ্ধির পরও শ্রমিকদের ক্রয়ক্ষমতা কার্যত কমছে।  কারণ দেশের গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনও ৯ শতাংশের ওপরে।

যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক বৃদ্ধি:  জাপানভিত্তিক সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার এক প্রতিবেদনে জানানো হয়,যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের পণ্যে অতিরিক্ত ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে, যা ৩৭ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। যদিও ট্রাম্প প্রশাসনের এই শুল্ক আরোপকে মার্কিন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য আদালত অনৈতিক বলে মন্তব্য করেছে, তবে এখনও তা প্রত্যাহার হয়নি।

ভারতের বাণিজ্য প্রতিবন্ধকতা: ২০২৫ সালের ১৭ মে ভারত সীমান্তবর্তী স্থলবন্দরগুলো দিয়ে বাংলাদেশের তৈরি পোশাকসহ কিছু পণ্যের আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করে। এই পদক্ষেপটি বাংলাদেশ কর্তৃক ভারতীয় সুতা আমদানিতে আরোপিত নিষেধাজ্ঞার জবাবে দেওয়া হয়। এতে বাংলাদেশের ভারতের বাজারে রপ্তানির প্রায় ৪২ শতাংশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, ফলে রপ্তানিকারকদের ব্যয়বহুল ও সময়সাপেক্ষ সমুদ্রপথ ব্যবহার করতে হচ্ছে।

জায়ান্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বিজিএমইএ-এর সাবেক সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, ‘ভারতের ট্রান্সশিপমেন্ট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় সরাসরি ফ্লাইট না থাকা দেশগুলোতে রপ্তানি ব্যয় বেড়েছে ও সময়ও বেশি লাগছে।’কমছে রপ্তানি আয়: ২০২৫ সালের আগস্ট থেকে টানা তিন মাস ধরে কমছে তৈরি পোশাকের রপ্তানি আয়। কমেছে রপ্তানি আদেশও। সবশেষ অক্টোবর মাসে রপ্তানি আয় কমেছে ৭ শতাংশ। রপ্তানি এবং আদেশ কমে যাওয়ার এ প্রবণতা চলতে থাকলে আগামী মাসগুলোতে তৈরি পোশাক খাত আরও বড় সংকটে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা বিশ্লেষকদের।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০২৫ এ আগস্ট মাসে পোশাক রপ্তানি কমে দাঁড়িয়েছে ৩১৭ কোটি ডলারে, যা আগের বছরের আগস্টে ছিল ৩৩৩ কোটি ডলার। আর অক্টোবর মাসে গত বছরের একই সময়ের তুলনায় পোশাক রপ্তানি কমেছে ২৮ কোটি ডলার। অন্যদিকে সেপ্টেম্বরে পোশাক রপ্তানির আদেশ ছিল ২৫৯ কোটি ডলার, যা অক্টোবরে কমে হয় ২২০ কোটি ডলার।

তৈরি পোশাক রপ্তানিকারকদের শীর্ষ সংগঠন বিজিএমইএ–র পরিচালক মাসুদ কবির বলেন, ‘বড় রপ্তানির জায়গা যেহেতু ইউরোপে ছিল, সেই মার্কেটে আমাদের সবচেয়ে বড় প্রতিযোগী চীন বা ভারতের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। ফলে আমাদের চেয়ে তারা (ইউরোপীয় ক্রেতারা) এই অল্টারনেটিভ মার্কেটগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, কারণ এখানকার পরিবেশটা ততটা ক্রেতাবান্ধব নয়।’

বিশ্লেষকরা বলছেন, আমেরিকায় মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ায় সে দেশের গ্রাহকরা চাহিদা অনুযায়ী পণ্য কিনতে পারছেন না। এর প্রভাব এসে পড়ছে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে।

সিপিডির গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘উচ্চ শুল্কের কারণে মার্কিন ক্রেতারা এখন আগের মতো পোশাক কিনতে পারছেন না। এটা শুধু খাদ্যপণ্য নয়, খাদ্য বহির্ভূত পণ্যের ক্ষেত্রেও সত্য। আমরা যে পোশাক পাঠাই, সেগুলোর ক্ষেত্রেও একই পরিস্থিতি। এতে আমেরিকায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, পণ্যের চাহিদা কমছে এবং আমাদের কাছ থেকে ক্রেতারা প্রত্যাশা অনুযায়ী কিনছেন না। উপরন্তু উচ্চ শুল্কের একটি অংশ ক্রেতারা আমাদের সরবরাহকারীদের ওপর চাপিয়ে দিতে চাইছেন।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরোস্ট্যাটের তথ্য বলছে, 'চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানি বেড়েছে ১৩ শতাংশ। একই সময়ে চীনের রপ্তানি বেড়েছে প্রায় ১৭ শতাংশ। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে এখনই নতুন বাজার, পণ্যের বহুমুখীকরণ ও নীতিগত সহায়তা জরুরি বলে মন্তব্য করেছেন সংশ্লিষ্টরা।'
দেশের অর্থনীতির অন্যতম ও প্রধান চালিকাশক্তি তৈরি পোশাক খাত। তবে মার্কিন শুল্কের ধাক্কা লাগতে শুরু করেছে এ খাতে। বিশেষ করে বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান পোশাক আমদানিকারক ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে চীন ও ভারতের ব্যাপক হারে প্রবেশ নতুন করে ভাবাচ্ছে দেশের রপ্তানিকারকদের।

বৈশ্বিক মন্দা ও অর্ডার হ্রাস: বিশ্বব্যাপী করোনা মহামারি পরবর্তী মন্দা এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের অভিঘাত কিছুটা কাটিয়ে উঠলেও ইরান-ইসরায়েল যুদ্ধ পরিস্থিতিতে আবার এক অনিশ্চিত ধাঁধায় পড়ে বৈশ্বিক অর্থনীতি। ফলে ইউরোপ, যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার মতো প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোতে পোশাক কেনার হার কমে যায়।

পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৪ সালের শেষ প্রান্তিকে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হওয়া পোশাকের অর্ডার গত বছরের তুলনায় গড়ে ৩০-৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। অনেক বড় বড় ব্র্যান্ড আগের মতো নিয়মিত অর্ডার না দিয়ে অপেক্ষা করছে বাজার স্বাভাবিক হওয়ার জন্য। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তারা।আন্তর্জাতিক বাজারে ক্রয়াদেশ ও দর কষাকষির চাপ এ অস্থিরতাকে আরও বাড়িয়েছে। বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দার কারণে, প্রধান আমদানিকারক দেশগুলোতে (যেমন : ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র) পোশাকের চাহিদা হ্রাস পেয়েছে। বায়াররা এখন পোশাকের দাম কমাতে তীব্র চাপ দিচ্ছে। ফলে অনেক ছোট কারখানা কম লাভে বা লোকসানে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে। বাংলাদেশ থেকে পোশাক আমদানির ক্ষেত্রে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে মূল্যহ্রাসের প্রবণতা দেখা গেছে, যেখানে প্রতিযোগিতামূলক বাজার ধরে রাখতে নির্মাতারা মার্জিন কমাতে বাধ্য হচ্ছেন।

কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি ও আমদানি জটিলতা: দেশের পোশাক খাত মূলত আমদানিনির্ভর। তুলা, কাপড়, বোতাম, জিপারসহ অন্যান্য কাঁচামালের বড় একটি অংশ চীন, ভারত, কোরিয়া, ইন্দোনেশিয়া থেকে আমদানি করা হয়। কিন্তু ডলার সংকট এবং এলসি খুলতে ব্যাংকগুলোর টালবাহানার কারণে কাঁচামাল আমদানি ব্যাহত হচ্ছে।

ফলে অনেক কারখানা কাঁচামালের ঘাটতির কারণে নির্ধারিত সময়মতো উৎপাদন চালিয়ে যেতে পারছে না। এমনকি কিছু কারখানায় উৎপাদন সাময়িকভাবে বন্ধও রাখতে হয়েছে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের মূল্যও বেড়েছে। তুলার দাম এক বছরে গড়ে ২০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। অথচ বিদেশি ক্রেতারা সেই অনুপাতে মূল্য বাড়াতে রাজি হচ্ছেন না।বিশেষ করে তুলা এবং ফেব্রিক্সের জন্য বাংলাদেশকে এখনো আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়। এই কাঁচামাল আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় ডলারের জোগান দিতে গিয়ে অনেক কারখানা সমস্যায় পড়ছে। এই খাতের ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শক্তিশালী হলেও, ৪৫ শতাংশেরও বেশি কাঁচামাল আমদানি করতে হয়। বৈশিক বাজারে তুলার দামের অস্থিরতা এবং দেশীয় ব্যাংকিং খাতে ডলারের তারল্য সংকট উভয়ই উৎপাদন খরচকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। 

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট: শিল্প খাতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে দেশে সাম্প্রতিক সময়ে জ্বালানি সংকট বিরাজমান। বিদ্যুৎ বিভ্রাট এবং গ্যাস চাপ কমে যাওয়ায় পোশাক কারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অনেক উদ্যোক্তা বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটরের ওপর নির্ভর করছেন, যার খরচ বহুগুণ বেশি।
বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটের কারণে, কারখানাগুলোতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে জ¦ালানি তেলের মূল্য সমন্বয় এবং গ্যাসের দাম বৃদ্ধির ফলে, পোশাক তৈরির সামগ্রিক ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে। উৎপাদন ব্যয়ের বৃদ্ধি (বিশেষত মজুরি ও ইউটিলিটি খরচ) এবং আন্তর্জাতিক বাজারে পোশাকের কম দাম এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করতে না পেরে অনেক ছোট এবং মাঝারি আকারের কারখানা তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হচ্ছে। 

বৈদেশিক মুদ্রা সংকট ও ব্যাংকিং জটিলতা: দেশে বর্তমানে ডলার সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ফলে আমদানি ব্যয় মেটাতে প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রা সময়মতো মিলছে না। অনেক ব্যাংক এখন পর্যন্ত বকেয়া এলসি খুলতে রাজি হচ্ছে না বা বিলম্ব করছে। এর ফলে উদ্যোক্তারা বাধ্য হচ্ছেন উচ্চ দামে কাঁচামাল কিনতে বা বিকল্প উৎসে যেতে, যা উৎপাদন খরচকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের কড়াকড়ি মনিটরিং, উচ্চ সুদের হার এবং নিয়ন্ত্রিত ডলার বিনিময় হারের কারণে উদ্যোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সেই সঙ্গে রপ্তানি আয়ের অর্থ ফেরত আসতেও বিলম্ব হচ্ছে, যা নগদ প্রবাহে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।বৈদেশিক ঋণ ১১২ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে, অথচ কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৬ শতাংশে হ্রাস পেয়েছে। অর্থনীতিতে নেই কোনো বৈচিত্র্যকরণ, বরং রপ্তানিমুখী পোশাক খাত প্রায় পুরোটাই আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। এছাড়া কম বৈচিত্র্যকরণ ও উদ্ভাবনে হতদরিদ্র অবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে এই খাতের জন্য উচ্চ ভঙ্গুরতা সৃষ্টি করছে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বৈশ্বিক ঝুঁকি। এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে পারেনি বাংলাদেশ সরকার।

কারখানা বন্ধ ও বেকারত্ব বৃদ্ধি: বাংলাদেশ গার্মেন্টস ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের তথ্যমতে, জানুয়ারি ২০২৪ থেকে মার্চ ২০২৫ পর্যন্ত তাদের সদস্যভুক্ত ১১৩টি পোশাক কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে প্রায় ৯৬,০০০-এরও বেশি শ্রমিক চাকরি হারিয়ে বেকার। যদিও এই সময়ে নতুন কিছু কারখানা চালু হয়েছে, কিন্তু বন্ধ হওয়া কারখানার সংখ্যা এবং বেকারত্বের হার উদ্বেগজনক। পোশাকশিল্প প্রধানত ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক হওয়ায়, দুই অঞ্চলেই অস্থিরতার প্রভাব বেশি অনুভূত হচ্ছে। গাজীপুর, সাভার, নারায়ণগঞ্জ এবং চট্টগ্রামের ইপিজেডসহ বিভিন্ন এলাকায় কারখানা বন্ধের ঘটনা বেড়েছে। শুধু চট্টগ্রামেই গত ৬ মাসে ৫২টি পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ার তথ্য জানা গেছে, যা হাজার হাজার শ্রমিককে বেকার করেছে। বন্ধ হয়ে যাওয়া কারখানাগুলোর অধিকাংশই ছিল ছোট ও মাঝারি আকারের, যারা আন্তর্জাতিক ক্রয়াদেশের পতন এবং কঠোর কমপ্লায়েন্সের মান ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়েছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে শ্রমিকরা তাদের বকেয়া মজুরি ও প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। যে কারণে মানবেতর জীবনযাপন করছে, যা সমাজের ওপর গুরুতর অর্থনৈতিক ও সামাজিক চাপ সৃষ্টি করছে।

রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির পর অ্যাকর্ড (বর্তমানে ইন্টারন্যাশনাল অ্যাকর্ড ফর হেলথ অ্যান্ড সেইফটি ইন দ্য টেক্সটাইল অ্যান্ড গার্মেন্টস ইন্ডাস্ট্রি) এবং অ্যালায়েন্সের (বর্তমানে নিরবচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত) মতো আন্তর্জাতিক উদ্যোগের মাধ্যমে কারখানাগুলোর কাঠামোগত নিরাপত্তা ও অগ্নি-সুরক্ষার ক্ষেত্রে অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। এই উদ্যোগগুলোর অধীনে ১,৬০০-এরও বেশি কারখানা পরিদর্শন করা হয়েছে এবং অধিকাংশ ত্রুটি দূর করা হয়েছে।

এলডিসি গ্রাজুয়েশন: সংশ্লিষ্টদের মতে, দেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিদ্যমান জ্বালানি সংকটের মধ্যে পোশাক খাতে সবচেয়ে বড় প্রভাব ফেলবে ২০২৬ সালের এলডিসি গ্রাজুয়েশন। ওই সময়ের পর বিভিন্ন দেশে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার বন্ধ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো দেশের সঙ্গেই মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) করতে পারেনি সরকার। অথচ প্রতিযোগী অন্যান্য দেশ এক্ষেত্রে অনেক এগিয়ে গেছে। 

বিজিএমইএ পরিচালক ও সুরমা গার্মেন্টসের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফয়সাল সামাদ বলেন, 'শুধু এই খাতটির ওপরে দেশের অর্থনীতির ৬০ থেকে ৮০ শতাংশ কোনো না কোনোভাবে জড়িত। তিনি বলেন, গ্রাজুয়েশনের জন্য যে ধরনের প্রস্তুতি দরকার তেমন কোনো প্রস্তুতি আমাদের নেই। এর জন্য গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান প্রয়োজন। ক্রেতা দেশগুলোর সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় এফটিএ চুক্তি হয়নি। আমাদের কোনো মাদার পোর্ট নেই, চট্টগ্রাম যেতে নেই কোনো উন্নত মহাসড়ক। ফলে এই পথে ব্যবসায়ীরা দীর্ঘ ভোগান্তির শিকার।

ব্যাংক সুদের হার, এসএমই খাতে ঋণ পেতে সমস্যা, চট্টগ্রাম বন্দরের ফি একবারে ৪১ শতাংশ বৃদ্ধিতে আমাদের সার্বিক কার্যক্রম বাধগ্রস্ত হচ্ছে। এরই মধ্যে পোশাক খাতে সরকার পূর্বে যে প্রণোদনা দিত তার ৬০ শতাংশ বন্ধ করে দিয়েছে। অথচ প্রতিবেশী ভারতের দিকে তাকান, সেখানে সরকার গার্মেন্টস খাতের জন্য নানা ধরনের প্রণোদনা দিচ্ছে। সেখানে বিনিয়োগের পর রিটার্নের সঙ্গে সরকার আরও দেয়। দক্ষিণ ভারতের বিহারসহ বিভিন্ন অঞ্চলে শ্রমিকদের বেতন-ভাতাও দিচ্ছে সরকার। আবার যুক্তরাজ্যের সঙ্গে এফটিএ চুক্তিও করে ফেলেছে ভারত। এমন পরিস্থিতিতে প্রতিযোগীদের সঙ্গে আমরা কিভাবে টিকে থাকব? 

উদীয়মান মানবাধিকার এবং পরিবেশগত ঝুঁকি ও দায় মূল্যায়ন এসব বিষয়ে জানতে চাইলে পোশাক মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ’র ভাইস প্রেসিডেন্ট এনামুল হক খান বলেন, পোশাক খাতের জন্য আগামী দিনে বেশ কিছু সংকট রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো এলডিসি গ্রাজুয়েশন।

অর্থনীতিবিদদের মতে, পোশাক খাতের মতো এমন পরিস্থিতি এখন দেশের অর্থনীতির। মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে গেছে। ব্যাংক খাতে ২৭ শতাংশের ওপরে নন-পারফর্মি লোন (খেলাপি ঋণ) বেসরকারি বিনিয়োগকে সংকুচিত করে ফেলেছে।

শ্রমিকদের দক্ষতা ঘাটতি এবং প্রযুক্তির অভাব:আন্তর্জাতিক বাজারে দ্রুত ডিজাইন পরিবর্তন ও উচ্চমানের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। কিন্তু অনেক কারখানা এখনো পুরনো প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করছে। ভ্যালু-অ্যাডেড পোশাক বা উচ্চমূল্যের পণ্য তৈরির জন্য যে ধরনের দক্ষ জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তি প্রয়োজন, তার অভাব রয়েছে। যে কারণে বাংলাদেশ এখনো মূলত বেসিক বা তুলনামূলক কম দামের পোশাক (যেমন- টি-শার্ট) রপ্তানির ওপর বেশি নির্ভরশীল।ভবিষ্যৎ টেকসইতার জন্য ‘গ্রিন ফ্যাক্টরি বা পরিবেশবান্ধব কারখানার সংখ্যা বৃদ্ধি অত্যন্ত ইতিবাচক দিক। বর্তমানে ইউএস গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল থেকে লিড সার্টিফিকেট পাওয়া পরিবেশবান্ধব পোশাক কারখানার সংখ্যা প্রায় ২০০টিরও বেশি, যা বিশ্বে সর্বোচ্চ। এ অর্জন বৈশ্বিক কমপ্লায়েন্স নিশ্চিত করতে সাহায্য করলেও, এটি শুধু বড় কারখানাগুলোর সক্ষমতাকে প্রতিফলিত করে, বেশিরভাগ ছোট কারখানা এখনো পিছিয়ে রয়েছে। সরকারের নীতি সহায়তা এবং প্রণোদনা এই খাতের জন্য অত্যন্ত জরুরি। 

ট্রাম্পের শুল্কের ছায়া: ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে কর:
দ্য ইকোনমিস্ট বলছে, আগামী সেপ্টেম্বর থেকে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কিছু দেশের তৈরি পোশাক পণ্যের ওপর ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত পাল্টা শুল্ক আরোপ করতে পারে। এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশি পোশাকের বাজার প্রতিযোগিতায় মারাত্মকভাবে পিছিয়ে পড়বে।

দ্য ইকোনমিস্ট বলছে,  বাংলাদেশ, যা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম তৈরি পোশাক রপ্তানিকারক দেশ, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত ৩৫ শতাংশ শুল্ক পুনরায় আলোচনার মাধ্যমে পর্যালোচনা করার চেষ্টা করছে। এই শুল্ক কার্যকর হলে তা ওই দিন থেকেই প্রযোজ্য হবে বলে জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প।এ প্রসঙ্গে দ্য ইকোনমিস্টকে বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রফতানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন  রুবেল বলেন, “এটি আমাদের জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ডেকে আনবে।

নারীকেন্দ্রিক শিল্প খাতের টিকে থাকার লড়াই:
বাংলাদেশের পোশাক শিল্প খাতে প্রায় ৪০ লাখ শ্রমিক সরাসরি যুক্ত, যাদের ৬০ শতাংশেরও বেশি নারী। দ্য ইকোনমিস্ট লিখেছে, ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন শুল্ক নীতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রে তৈরি পোশাকের দাম বৃদ্ধি পাবে, তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত হবেন দরিদ্র নারী শ্রমিকরা, যারা এই শিল্পে নির্ভরশীল। প্রতিবেদনটি দক্ষিণ এশিয়ার প্রসঙ্গ টেনে বলেছে, ‘ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার তৈরি পোশাক শিল্পে কয়েক কোটি নারী কর্মরত। এই শিল্পই তাদের আর্থিক স্বাধীনতার পথ তৈরি করেছে।

নারীর ক্ষমতায়নের জন্যও হুমকি:

বাংলাদেশের পোশাক শিল্প শুধু অর্থনৈতিক উন্নয়নের চালিকাশক্তি নয়, এটি নারীর ক্ষমতায়নের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এর এক তথ্যে বলা হয়েছে, পোশাক শিল্পে নারীর অংশগ্রহণ কর্মসংস্থানের মাধ্যমে পরিবার ও সমাজে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি করেছে।

দ্য ইকোনমিস্ট সতর্ক করে বলেছে, ‘দক্ষিণ এশিয়ায় নারীর কাজের সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে, আর ট্রাম্পের নতুন বাণিজ্য নীতি তা আরও বাড়াবে।’ 

প্রতিযোগী দেশগুলোর অগ্রগতি: বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত একসময় চীনের বিকল্প হিসেবে দাঁড়ালেও বর্তমানে ভিয়েতনাম, কম্বোডিয়া, তুরস্ক ও মিয়ানমারের মতো দেশগুলো দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। এই দেশগুলো তুলনামূলকভাবে দক্ষ শ্রমিক, উন্নত অবকাঠামো এবং সরকারের নানামুখী সহায়তার কারণে ক্রেতাদের কাছে আকর্ষণীয় হয়ে উঠছে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি বাংলাদেশ ত্বরিত ও কার্যকর উদ্যোগ না নেয়, তবে আগামী কয়েক বছরে বৈশ্বিক বাজারে অবস্থান হারানোর ঝুঁকি তৈরি হবে।

সরকারি উদ্যোগ ও সীমাবদ্ধতা: সরকার সংকট নিরসনে কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। রফতানিকারকদের জন্য নগদ প্রণোদনা, রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে সহজ ঋণ এবং এলসি প্রক্রিয়া সহজীকরণের চেষ্টা চলছে। শিল্প মালিকরা বলছেন, সরকারের নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন হলেও তা বাস্তবে সময়মতো হাতে আসে না। বিদ্যুৎ ও গ্যাস সরবরাহ নিয়ে যেসব প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়, তারও বাস্তবায়ন ব্যাহত হচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যায়ের  সাবেক শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক  বলেন, ‘সম্প্রতি ভারত আমাদের ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বাতিল করেছে। এতেও কিন্তু একটা নেতিবাচক প্রভাব রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র যে নতুন শুল্ক আরোপ করেছে তা কঠিন পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাবে। যদিও তা আলোচানা চলমান। সরকার চেষ্টা করছে একটা সমাধানে।’

সম্ভাব্য সমাধানের উপায়/ করণীয়: 
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবিলায় বাংলাদেশকে কূটনৈতিকভাবে দ্রুত এবং শক্ত প্রতিক্রিয়া দেখাতে হবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় বসে এই শুল্ক নীতি থেকে অব্যাহতি বা হ্রাস আদায়ের কৌশল নিতে হবে। পাশাপাশি নতুন বাজার অনুসন্ধান, রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও মূল্য সংযোজন বাড়ানো ছাড়া বিকল্প নেই।
এ অবস্থায় রাষ্ট্র, শিল্প মালিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সম্মিলিতভাবে কাজ করা ছাড়া এই সংকট কাটিয়ে ওঠা সম্ভব নয়।

পোশাকশিল্প এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়তা এবং রোবোটিক্সের ব্যবহার উৎপাদনশীলতা বাড়াতে সাহায্য করবে ঠিকই, কিন্তু এর ফলে কম দক্ষতাসম্পন্ন শ্রমিকদের, বিশেষ করে নারীদের, চাকরি হারানোর ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে। শিল্প মালিকদের প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সুবিধা নিতে হবে, কিন্তু শ্রমিকদের নতুন প্রযুক্তির জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং তাদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করার জন্য সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা অপরিহার্য।
এই খাতকে দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল করতে হলে শুধু তুলানির্ভর পোশাকের পরিবর্তে নন-কটন (যেমন সিনথেটিক ও কৃত্রিম ফাইবার) পোশাক উৎপাদনে মনোযোগ দিতে হবে। বর্তমানে বাংলাদেশের রপ্তানির ৭৪ শতাংশেরও বেশি কটনভিত্তিক। বিশ্ববাজারের চাহিদা অনুযায়ী, কৃত্রিম ফাইবারভিত্তিক পোশাকের উৎপাদন বাড়িয়ে পণ্যের বৈচিত্র্য আনতে পারলে, প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা বাড়বে এবং রপ্তানি বাজার আরও সুরক্ষিত হবে।

পোশাকশিল্পের পণ্য দ্রুত বিশ্ববাজারে পৌঁছানোর জন্য উন্নত সড়ক ও রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা অপরিহার্য।  ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে যানজট এবং বন্দরে কনটেইনার জট এখনো বড় চ্যালেঞ্জ।  
যেহেতু বাংলাদেশের অধিকাংশ কারখানা ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল এবং নদীগুলোতে দূষণ একটি গুরুতর সমস্যা, তাই আন্তর্জাতিক বাজারে টিকে থাকতে হলে জিরো ডিসচার্জ নীতি অনুসরণ করে পরিবেশবান্ধব উৎপাদন প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু এটি দীর্ঘমেয়াদি এবং ব্যয়বহুল।

লেখক,জান্নাতুল সাদিয়া 
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর

জিএ

 

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন