বাজেট বৈষম্য নিরসরে কোন পথে সরকার? প্রধানমন্ত্রীর উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল সফর

মো. হাবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১৮:৩৬, ২০ অক্টোবর ২০২৬

বাজেট বৈষম্য নিরসরে কোন পথে সরকার? প্রধানমন্ত্রীর উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চল সফর

ছবি: সংগৃহীত

একটি সমাজ ও রাষ্ট্র সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য মানুষের মাঝে প্রীতি ও সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বিদ্যমান থাকা আবশ্যক। কবি কাজী নজরুল ইসলাম ‘মানুষ’ কবিতায় বলেন- “গাহি সাম্যের গান-মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান,। আদিমকালে মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে দলবদ্ধ হয়ে বসবাস শুরু করে। পরবর্তীতে নিজেদের প্রয়োজনে রাষ্ট্র গড়ে তোলে। একটি রাষ্ট্র বিভিন্নভাবে গড়ে উঠে। রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্বের অনেক রাষ্ট্রই স্বাধীনতা লাভ করেছে। তার মধ্যে বাংলাদেশ অন্যতম। যুদ্ধ কিভাবে সংঘটিত হয়? মানুষের সাথে যুদ্ধের সম্পর্ক কি? এগুলো নিয়ে লেখক ও গবেষকদের নানা বিশ্লেষণ রয়েছে।

সরদার ফজলুল করিম অনুদিত রুশোর সোশ্যাল কন্ট্রাক্ট গ্রন্থে (২০০০) বলেন- আসলে আদিতে মানুষ মানুষের সঙ্গে বাস করত শান্তির সম্পর্কে, যুদ্ধের সম্পর্কে নয়। তেমন অবস্থায় মানুষের সঙ্গে মানুষের দীর্ঘকালীন কোনো যুদ্ধের অবস্থাকে কল্পনা করা চলে না। সেই অবস্থায় মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক প্রকৃতিগত, কোনো পারস্পারিক শত্রুতার সম্পর্ক নয়। . . . যুদ্ধ মানুষের বিরুদ্ধে মানুষের নয়। যুদ্ধ সংঘটিত হয় রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রের। রাষ্ট্রের এমন যুদ্ধের মধ্যে জড়িত এ পক্ষ কিংবা ও-পক্ষের, সাধারণ মানুষ পরস্পরের শত্রু নয়। তাদের পরস্পরের শত্রু বলে অভিহিত করার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। মানুষের সামাজিক নিয়মের বাইরে অনিয়মের এ-ঘটনা। রাষ্ট্রের সঙ্গে রাষ্ট্রের এমন যুদ্ধে এ-পক্ষের মানুষ বা যোদ্ধা যখন অপর পক্ষের যোদ্ধার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে তখন তারা নাগরিক হিসাবে নাগরিকের বিরুদ্ধে ‍যুদ্ধ করে না। তারা যুদ্ধ করে সৈন্য হিসাবে। এক রাষ্ট্রের সৈন্যের বিরুদ্ধে অপর রাষ্ট্রের সৈন্যের যুদ্ধ।”

বিভিন্ন গোত্র ও ধর্মের মানুষ সমাজে বসবাস করে। হিন্দু ও মুসলমান সম্পর্ক নিয়ে অনেক আলোচনা ও স্পর্শকাতর বিষয় রয়েছে। এগুলো নিয়ে সাধারণত সামাজিক, ধর্মীয় ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে পর্যালোচনা করা হয়। উন্নত বিশ্ব, মধ্যপ্রাচ্য এবং ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে হিন্দু ও মুসলিম সম্পর্ক তুলনামূলকভাবে অনেক ভালো অবস্থানে রয়েছে। ড. মো. রুহুল আমিন ও ড. মো. রেজাউল করিম (২০১৬) তাঁদের লিখিত গ্রন্থ বাংলায় হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক (১৭৫৭-১৯১৬) তে উল্লেখ করেন- মুসলিম শাসনের শুরু থেকে কয়েক শতাব্দীকাল পর্যন্ত বাংলায় হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায় অভিন্ন ভৌগলিক ও প্রাকৃতিক পরিবেশে নিজেদের স্বতন্ত্র ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক জীবনাচারণ নিয়ে পাশাপাশি বসবাস করে আত্মীয়র বন্ধনে। তাঁদের পারস্পারিক ধর্মীয় ও সাম্প্রদায়িক স্বাতন্ত্র চেতনা সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনের লক্ষ্য অর্জনে কোন দ্বন্দ্ব-সংঘাতের সৃষ্টি করেনি। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনামলে বাংলায় হিন্দু-মুসলমানদের ধর্মীয় পার্থক্য তাদের সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক জীবনে দারুণভাবে সংকট সৃষ্টি করে।

বাংলা সাহিত্য এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিম সম্পর্ক সুদৃঢ় করার জন্য লেখক, কবি ও সাহিত্যিকগণ অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। যেমন কাজী নজরুল ইসলাম হিন্দু-মুসলমানদের মিলনের প্রয়োজন ব্যাখ্যা করে বলেন- “এস ভাই হিন্দু। এস মুসলমান। এস বৌদ্ধ। এস ক্রিশ্চিয়ান। আজ আমরা সব সংকীর্ণতা সব মিথ্যা সব স্বার্থ চিরতরে পরিহার করে প্রাণ ভরে ভাইকে ভাই বলে ডাকি। আজ আমরা আর কলহ করব না।” মুসলিম ও অমুসলিম সম্প্রীতির ওপর রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা অনেকাংশে নির্ভর করে। বাংলাদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী অন্যান্য অমুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য বেশি। কারণ ভূ-রাজনৈতিক ও অন্যান্য কারণে যাতে কেউ হয়রানীর শিকার না হয়, সে বিষয়ে মুসলিম জনগোষ্ঠীর ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টা থাকতে হবে। কারণ কোন হঠকারিতা ও কূটকৌশলে যাতে কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে কোন ফাটল না ধরায়, সে বিষয়ে সজাগ দৃষ্টিপাত করতে হবে। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন- ’ধর্ম যার যার- রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার-যার- নিরাপত্তা পাবার অধিকার সবার ‘।

সাম্প্রতিক সময়ে দেশব্যাপী প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী, এমপি ও জনপ্রতিনিধিদের সফর ইতিবাচক দিক। কারণ এ সফরের মাধ্যমে দেশের প্রকৃত অবস্থা স্বচক্ষে পর্যবেক্ষণের সুযোগ রয়েছে। সে অনুযায়ী পরবর্তীতে করণীয় ঠিক করা যাবে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সরকারের প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমান ২০ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ (মঙ্গলবার) রংপুর, রাজশাহী এবং চট্টগ্রাম জেলা সফর করবেন। হিন্দু ধর্মালম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে মূলত পূজামণ্ডপে উপস্থিতি ও পরিদর্শন, রাজশাহী জনসভায় যোগদান, এবং অন্যান্য নির্ধারিত কর্মসূচি বাস্তবায়নে সফর নির্ধারিত করা হয়েছে। সফরের পূর্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) কর্তৃক বেশ কিছু প্রকল্প অনুমোদিত হয়েছে। তার মধ্যে রংপুর সিটি কর্পোরেশনকে নিয়ে যে প্রকল্প অনুমোদন পেয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে।

বর্তমান সরকার বাজেট বৈষম্য নিরসরে ইতোমধ্যে ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। সরকারে গঠনের পর অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং সমৃদ্ধ দেশ গঠনে বর্তমান সরকার নানামূখী উদ্যোগ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে। আজকের আলোচনা মূলত রংপুরকে কেন্দ্র করে। রংপুর সিটি কর্পোরেশন সিটি কর্পোরেশন হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ২৮ জুন ২০১২ খ্রিস্টাব্দ। সর্বমোট এখানে ৩৩ টি ওয়ার্ড রয়েছে। রংপুর সিটি কর্পোরেশন বর্তমান প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর উন্নয়নের জন্য আপ্রাণ প্রচেষ্টা চালিয়েছেন। এ বাজেট অনুমোদিত হওয়ায় তাঁর জন্য রংপুর সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়ন করা সহজ হবে।

মূলত রংপুর দীর্ঘদিন ধরে বাজেট বৈষম্যের শিকার এবং অবহেলিত এক জনপদের নাম। বর্তমান সরকার সম্প্রতি রংপুর সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়নের জন্য ১৬০২.৭ কোটি টাকা এবং ক্ষতিগ্রস্থ রাস্তা পুনর্বাসন-এর জন্য ২১০.৪ কোটি টাকার প্রকল্প একনেক অনুমোদন করছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ভালো ও প্রশংসনীয় পরিকল্পনা। কারণ বিগত সময়ে তার বিপরীত অবস্থা পরিলক্ষিত হয়েছে। কারণ অন্যান্য সরকারের সময়ে দেখা যেতো যে সকল আসলে সরকারী দল আসন লাভ করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে বাজেট বৈষম্য করা হয়েছে। সেজন্য এ বিষয়টি রংপুর অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর কাছে আনন্দের ও গর্বের। অন্যদিকে রংপুর সিটি কর্পোরেশ এর বর্তমান প্রশাসক এডভোকেট মাহফুজ উন নবী চৌধুরী ডন এ প্রকল্প অনুমোদন করায় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জনাব তারেক রহমানকে অভিনন্দন ও কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন। এবং প্রকল্প অনুমোদন পরবর্তী সংবর্ধনা সভায় তিনি ১৮১৩.১ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নে জবাদিহিতা এবং দুর্নীতি প্রশয় না দেওয়া অঙ্গিকার ব্যক্ত করেছেন। যা নিঃসন্দেহে একটি ভালো দিক। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ছয়টি আসনেই ১১ দলীয় জোটের প্রার্থীরা জয় পেয়েছিল। সুতরাং বিরোধী দলের আসনে সরকার দল সাধারণত অতীতে বাজেট বরাদ্দ দেওয়ার রীতি রয়েছে। সেজন্য ভবিষ্যতে এটা একটা রেকর্ড হয়ে থাকবে। পাশাপাশি স্থানীয় ও জাতীয় নির্বাচনে ভোটারদের ‘ভোটিং বিহেভিয়ারে” প্রভাব বিস্তার করবে। রংপুরে উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। রংপুরে অনেক ঐতিহাসিক, প্রত্নতাত্ত্বিক এবং সাংস্কৃতিক নিদর্শন রয়েছে, সেগুলো সংস্কার, মেরামত এবং দৃষ্টিনন্দন করতে পারলে এ অঞ্চলে পর্যটন শিল্পের বিকাশ ঘটবে। এবং পাশাপাশি আঞ্চলিক অর্থনীতির চালিকাশক্তি বৃদ্ধি পাবে। কর্মসংস্থান এবং অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি নিশ্চিত হবে।

রংপুরে বাজেট বৈষম্য নিরসরে সরকারের পদক্ষেপকে সাধুবাদ। এ কারণে যে, বাজেট বৈষম্য নিরসন করাটা অত্যন্ত প্রয়োজন ছিল। একটি সমৃদ্ধ ও স্থিতিশীল এবং টেকসই সরকারের জন্য নাগরিক সুবিধা সমানভাবে বণ্টন করা অত্যাবশ্যক। তা না হলে এ গুলো থেকে নানামুখী চ্যালেঞ্জ ও সমস্যার সৃষ্টি হয়। যেমন সহিংসতা ‍দুইভাবে সৃষ্টি হতে পারে। প্রত্যক্ষ ও কাঠামোগত সহিংসতা তার মধ্যে অন্যতম। মধ্যস্থতাকারী, সালিসকারী, গবেষক এবং শান্তি মনোবিজ্ঞানীগণ (ইয়োহান গালতুনসহ) অনেকেই কাঠামোগত সহিংসতার উপাদান নিয়ে উদ্বিগ্ন। মানুষ হত্যা যেমন সরাসরি সহিংসতার উপাদান। তেমনি কাঠামোগত সহিংসতা মানুষকে ক্রমান্বয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয় যখন ব্যক্তি তার মৌলিক চাহিদা থেকে বঞ্চিত হয়। জীবনকাল হ্রাস পায় যখন জনগণ সামাজিক, রাজনৈতিক অথবা অর্থনৈতিকভাবে শোষিত হয়। কাঠামোগত সহিংসতা বৈশ্বিক সমস্যা হলেও দেশের অভ্যন্তরে এ সমস্যার যাতে বিস্তার না হয়, সেজন্য সরকারকে সবসময় আন্তরিক হতে হয়। জুলাই গণঅভ্যূত্থান তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। রংপুর সিটি কর্পোরেশনের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেটের অনুমোদনের মাধ্যমে মানুষের বিদ্যমান ক্ষোভ কিছুটা প্রশমিত হবে। এ বাজেটের মাধ্যমে বৈমাত্রেয় আচরণ প্রদর্শনের যে রীতি দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ছিল তার পরিবর্তন সূচিত হয়েছে।

রংপুর সিটি কর্পোরশনে সাম্প্রতিক বাজেট অনুমোদন যে শুরু হয়েছে, তা অব্যাহত রাখতে হবে। কারণ জাতীয় ও আঞ্চলিক অর্থনীতিতে এ অঞ্চলের অনেক অবদান রয়েছে। রংপুর অঞ্চলের উন্নয়ন কার্যক্রম সচল, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বরাদ্দ বৃদ্ধি, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুরের অধিকতর সম্প্রসারণ উন্নয়ন প্রকল্প (সরকারের বার্ষিক কর্মসূচির সবুজ পাতায় ইতোমধ্যে অন্তর্ভুক্ত)একনেকে অনুমোদন ইত্যাদির জন্য এ অঞ্চলের জনগণকে বর্তমান সরকারকে সহযোগিতা করা প্রয়োজন। সরকারকেও নাগরিক সুবিধা বৃদ্ধি ও বাজেট বৈষম্য নিরসনের জন্য এ অঞ্চলের উন্নয়নের জন্য বাজেট বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে জনপ্রতিনিধিগণ, রংপুর সিটি কর্পোরেশন বর্তমান প্রশাসক মাহফুজ উন নবী চৌধুরী, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এর মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুসহ অন্যান্য ব্যক্তিরা এ ক্ষেত্রে সরকারের সাথে চাপসৃষ্টিকারীর ভূমিকা পালন করতে পারে। এ অঞ্চলের অনেক সমস্যা রয়েছে, সরকারকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ সমস্যাগুলো সমাধান করা প্রয়োজন।

লেখক,মো. হাবিবুর রহমান
লেখক, কবি ও গবেষক

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন