আবদুল হালিম
প্রকাশ: ১২:৪৪, ২৬ জুন ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
মানবসভ্যতার ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যা কেবল একটি তারিখ নয়; বরং যুগ যুগ ধরে সত্য, ন্যায়, ত্যাগ ও আত্মশুদ্ধির প্রতীক হয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকে। ইসলামী বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস মহররমের দশম দিন—পবিত্র আশুরা—তেমনই এক মহিমান্বিত দিন। এ দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য কেবল একটি স্মরণীয় দিবস নয়; বরং আল্লাহর রহমত, নবীদের সংগ্রাম, মজলুমের বিজয় এবং সত্যের প্রতি অবিচল থাকার এক অনন্য শিক্ষা।
বর্তমান পৃথিবীতে আমরা এমন এক সময়ে বসবাস করছি, যখন মানুষ বাহ্যিক সাফল্যের পেছনে ছুটতে ছুটতে অনেক সময় নিজের অন্তর্জগতকে ভুলে যাচ্ছে। ভোগের প্রাচুর্য বাড়ছে, কিন্তু মানসিক প্রশান্তি কমছে। এমন এক বাস্তবতায় আশুরা আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়—মানুষের প্রকৃত শক্তি কোথায়? ক্ষমতায়, সম্পদে, নাকি বিশ্বাস ও নৈতিকতায়?
ইসলামী ঐতিহ্যে আশুরা একটি ঘটনাবহুল দিবস হিসেবে পরিচিত। বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, এ দিনে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল। বলা হয়, হযরত আদম (আ.)-এর সৃষ্টি ও তওবা কবুল, হযরত নূহ (আ.)-এর নৌকার জুদি পর্বতে অবতরণ, হযরত ইবরাহিম (আ.)-এর অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তি, হযরত আইয়ুব (আ.)-এর রোগমুক্তি, হযরত ইউনুস (আ.)-এর মাছের পেট থেকে মুক্তিলাভ এবং হযরত মূসা (আ.)-এর ফেরাউনের কবল থেকে পরিত্রাণ লাভ—এসব ঘটনার সঙ্গে আশুরার দিনের সম্পর্ক রয়েছে বলে ইতিহাসে বর্ণিত হয়েছে।কুরআন আমাদের জানায়, যখন সামনে ছিল উত্তাল সমুদ্র আর পেছনে ফেরাউনের সশস্ত্র বাহিনী, তখন পরিস্থিতি মানবিক দৃষ্টিতে ছিল প্রায় আশাহীন। কিন্তু ঈমানের দৃষ্টিতে ছিল আল্লাহর সাহায্যের প্রত্যাশা। মূসা (আ.)-এর সেই অটল বিশ্বাস—“নিশ্চয়ই আমার রব আমার সঙ্গে আছেন”—আজও প্রতিটি মুমিনের জন্য সাহসের উৎস।
রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার দিন রোজা পালন করেছেন এবং তাঁর সাহাবিদেরও তা পালনের উৎসাহ দিয়েছেন। সহিহ মুসলিমের বর্ণনা অনুযায়ী, আশুরার রোজা পূর্ববর্তী এক বছরের সগিরা গুনাহের কাফফারার কারণ হতে পারে। এ কারণে আশুরা কেবল ইতিহাস স্মরণের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনা ও আত্মশুদ্ধিরও একটি মূল্যবান সুযোগ।
আশুরার আলোচনা কারবালাকে ছাড়া পূর্ণতা পায় না। ৬১ হিজরির ১০ মহররম কারবালার প্রান্তরে সংঘটিত হয় ইসলামের ইতিহাসের অন্যতম হৃদয়বিদারক ঘটনা। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্র হযরত ইমাম হুসাইন (রা.) অন্যায়ের কাছে মাথা নত না করে শাহাদাতকে বরণ করে নিয়েছিলেন। তাঁর আত্মত্যাগ কেবল একটি রাজনৈতিক ঘটনার নাম নয়; এটি নৈতিক সাহস, আদর্শিক দৃঢ়তা এবং সত্যের প্রতি অটল আনুগত্যের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।
কারবালার শিক্ষা আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ প্রতিটি যুগেই সত্য ও মিথ্যার দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। প্রতিটি সময়েই মানুষের সামনে নীতি ও স্বার্থের মধ্যে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন আসে। ইমাম হুসাইন (রা.) আমাদের শিখিয়েছেন, সাময়িক লাভের জন্য সত্যকে বিসর্জন দেওয়া যায় না। ইতিহাস শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাবানদের নয়, আদর্শবানদেরই স্মরণ করে।
আশুরার প্রকৃত তাৎপর্য এখানেই যে, এটি আমাদের অতীত স্মরণ করায়, বর্তমানকে মূল্যায়ন করতে শেখায় এবং ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত হতে উদ্বুদ্ধ করে। এই দিন আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনের প্রতিটি পরীক্ষার পেছনে আল্লাহর প্রজ্ঞা রয়েছে; প্রতিটি অন্ধকারের পর আলো আসে; আর সত্য কখনো চিরদিন পরাজিত থাকে না।
আজ যখন আমরা আশুরাকে স্মরণ করি, তখন প্রয়োজন কেবল কিছু আনুষ্ঠানিকতা পালন নয়; বরং এর শিক্ষা নিজেদের জীবনে ধারণ করা। সত্যবাদিতা, ন্যায়পরায়ণতা, ধৈর্য, ত্যাগ ও আল্লাহর প্রতি নির্ভরতার গুণাবলি যদি আমাদের ব্যক্তি ও সামাজিক জীবনে প্রতিফলিত হয়, তবেই আশুরার প্রকৃত শিক্ষা বাস্তবায়িত হবে।
পরিশেষে বলা যায় - ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখি, ফিরাউনের নাম আজ অত্যাচারের প্রতীক; আর মূসা (আ.) স্মরণীয় হয়েছেন ঈমান ও মুক্তির প্রতীক হিসেবে। ইয়াজিদের পরিচয় ইতিহাসে অন্ধকারের সঙ্গে যুক্ত; আর হুসাইন (রা.) আজও সম্মানিত সত্য ও আত্মত্যাগের প্রতীক হিসেবে। এটাই আশুরার সবচেয়ে বড় শিক্ষা—ক্ষমতা নয়, সত্যই শেষ পর্যন্ত বিজয়ী হয়।
তথ্যসূত্র
১. পবিত্র কুরআন, সূরা ইউনুস: ৯০-৯২।
২. পবিত্র কুরআন, সূরা আশ-শু‘আরা: ৬১-৬৮।
৩. সহিহ বুখারি, হাদিস নং ২০০৪।
৪. সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৬২।
৫. ইবনু কাছির, আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া।
৬. ইবনু হাজার আল-আসকালানি, ফাতহুল বারি।
লেখক,আবদুল হালিম
শিক্ষার্থী, আরবি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ
আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রাম