রবিউল আলম
প্রকাশ: ০৯:৪৫, ৪ জুন ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ইউলিয়াম পেনের মতে- ঈশ্বরের পরবর্তী স্থানই পিতা-মাতার। পিতামাতার মত এত দরদি নিঃস্বার্থ মায়া-মমতার অধিকারী পৃথিবীতে অদ্বিতীয়। পাশাপাশি সন্তানের প্রতি তাদের ভালোবাসা অকৃত্রিম, নিখাঁদ, নিষ্কলুষ, নির্মল ও খাঁটি বটে যেটার কিঞ্চিৎ পরিমাণ ঝঞ্ঝাট নেই। তাদের খাওয়া-দাওয়া ও আরাম-আয়েশের জীবনখানি প্রতিনিয়ত উৎসর্গ করে সন্তানের সুস্থ ও স্বচ্ছল জীবন নির্বাহের জন্য মঙ্গলকামনা বা ফিকির করে থাকে।
আমাদের প্রতিটি শ্বাস-প্রশ্বাসে ও জীবনের পরতে পরতে তাদের অনুগ্রহ এবং বিপুল অবদান বিদ্যমান যা কখনও শোধ করার মতো নয়। সম্ভবত তাদের শুধু একটাই প্রত্যাশা- সন্তান যেন তাদের ভালোবাসুক, খেদমত করুক, জীবনের ক্রান্তিলগ্নে পাশে থাকুক ও বুক-ভরা শ্রদ্ধা করুক ইত্যাদি। কুরআন সুন্নাহও তাদের সেবা-যত্ন ও ভরণপোষণের দায়িত্ব নিয়ে মন জয় করতে বলেছে। তাছাড়া এটাই সহস্র বছরের প্রকৃতি, প্রথা, ধর্মীয় ও সভ্য সমাজে স্বীকৃত। পিতামাতাকে বৃদ্ধ-বয়সে একাকিত্ব ও নানা ধরনের বঞ্চনা থেকে পরিত্রাণের রক্ষাকবচ হিসেবে আমাদের দেশে “পিতামাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩" প্রণয়ন করা হয়। যেখানে খাওয়া-দাওয়া, অন্ন, বস্ত্র, চিকিৎসা ও বাসস্থানসহ আর্থিক বিষয়ের পাশাপাশি পিতামাতাকে সময় দেওয়া বা সঙ্গ দেওয়ার বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সক্ষম বা সামর্থ্যবান সন্তান তার পিতামাতাকে খোরপোষ দিতে বাধ্য থাকিবে। যদি একাধিক সন্তান থাকলে- নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে খোরপোষের পরিমাণ নির্ধারণ করবে। তাছাড়া কোনো পিতা সন্তানের সাথে বসবাস করতে না চাইলেও সন্তানের আয়-রোজগার অনুযায়ী যুক্তিসঙ্গত পরিমাণ খোরপোষ মা-বাবাকে দিতে বাধ্য থাকিবে। এই আইনের ৩ ধারায় বলা হয়- কোনো সন্তান তার পিতামাতাকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে আলাদা কিংবা একত্রে কোথাও নিবাস করে থাকতে বাধ্য করতে পারবে না। বরং নিয়মিত খোঁজ-খবর, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক অবস্থা সম্পর্কে দেখবাল করা লাগবে। প্রসঙ্গত ৫ ধারায় শাস্তির বিধানও বলা হয়েছে যে ভরণপোষণ না দিলে কিংবা কেউ বাঁধা দিলে অথবা অস্বীকার করলেও সমান অপরাধে গণ্য হবে। শাস্তি সর্বোচ্চ ১ লক্ষ টাকা অর্থদণ্ড এবং জরিমানা অনাদায়ে তিনমাস কারাদণ্ড প্রদান করা হবে।
উল্লেখ্য- এটা আমলযোগ্য ও মীমাংসাযোগ্য হওয়ায় ১ম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে বিচার যোগ্য হবে। কিন্তু বর্তমান সমাজে আইনি বিধান থাকলেও যথাযথ প্রয়োগ দেখা যায় না। থাকলেও তোয়াক্কা করে না। কারণ কোনো পিতামাতা চান না তাদের আদরের টুকরো সন্তানটা হয়রানির শিকার হোক কিংবা সরকারের কাছে অভিযোগে সোপর্দ করা হোক।
ভরণপোষণে ধর্মীয় দায়বদ্ধতা:
সমর্থ থাকা সত্ত্বেও অভাবগ্রস্ত মা-বাবার খরচ না দিলে গুনাহগার হবে। এ ক্ষেত্রে সন্তানরা স্বেচ্ছায় না দিলে অভাবগ্রস্ত মাতা-পিতা ছেলে-মেয়ের সম্পদ থেকে প্রয়োজন পরিমাণ তাদের অনুমতি ছাড়াও নিতে পারবেন। তবে মা-বাবা বিত্তবান হলে অনুমতি ছাড়া ছেলে-মেয়ের সম্পদ থেকে নেওয়া বৈধ হবে না। (ফাতাওয়ায়ে হিন্দিয়া : ১/৫৬৪)
মা-বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব কার কার ওপর? এমন প্রশ্নের উত্তরে ফাতহুল কাদিরে স্পষ্ট ফতোয়া জারি করা হয়েছে। মা-বাবার ভরণ-পোষণের দায়িত্ব উপরোক্ত দুই শর্তে সব ছেলে-মেয়ের ওপর ওয়াজিব। এ দায়িত্ব সব সাবালক সামর্থ্যবান ছেলে-মেয়ের ওপর সমভাবে বর্তাবে। এ ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই, তাই কোনো মেয়ে যদি সামর্থ্যবান ও বিত্তবান হয়, তাহলে ছেলেদের মতো সমভাবে তার ওপরও মা-বাবার খরচের দায়িত্ব বর্তাবে।
কেননা মা-বাবার জীবিত অবস্থায় সন্তানের জন্য খরচ ও উপহারে মেয়েরাও তাদের ভাইদের মতো সমঅধিকারী, তাই মা-বাবার খরচ বহনে তারাও সামর্থ্যের শর্তে তাদের ভাইদের সমদায়িত্বশীল হবে। ছেলে-মেয়ে না থাকলে তারপর সিরিয়াল আসবে নাতি-নাতনিদের। অতএব, তাদের ওপর সমভাবে এ দায়িত্ব বর্তাবে। (ফাতহুল কাদির : ৪/৪১৭)
সুতরাং এমন অকৃত্রিম ভালোবাসার প্রতিদান হিসেবে বৃদ্ধাশ্রমই তাদের শেষ সদন। অতএব আধুনিক উচ্চশিক্ষিত ও সভ্য সমাজ তৈরির কারখানার চেয়ে নৈতিক ও শুদ্ধাচার জাতি উপহার দিন। আইনগত সেবা না করে নৈতিক দায়িত্ব ও হৃদয়ের মণিকোঠায় শেষ বয়সি পৃথিবার স্বর্গকে (মা-বাবা) স্থান দিন।
রবিউল আলম
শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়