সুলতানা আক্তার
প্রকাশ: ২০:৩৪, ৩১ মে ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
আধুনিক বিশ্বের উন্নয়ন, শিল্প, যোগাযোগ ও প্রযুক্তি—সবকিছুর মূল চালিকাশক্তি জ্বালানি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বজুড়ে দেখা দেওয়া জ্বালানি সংকট মানুষের দৈনন্দিন জীবন থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় অর্থনীতিতেও বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। বিদ্যুৎ ঘাটতি, জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি এবং উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় দেশের সাধারণ মানুষ ও শিল্পখাত উভয়ই চাপের মুখে পড়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি সংকট মূলত এমন একটি পরিস্থিতি, যখন চাহিদার তুলনায় জ্বালানির সরবরাহ কমে যায় অথবা সরবরাহ ব্যয়বহুল হয়ে পড়ে। আন্তর্জাতিক বাজারে তেল ও গ্যাসের দাম বৃদ্ধি, বৈশ্বিক রাজনৈতিক অস্থিরতা, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আমদানিনির্ভর জ্বালানি ব্যবস্থার কারণে এই সংকট আরও তীব্র হয়েছে।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশই গ্যাসনির্ভর। কিন্তু দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন কমে যাওয়ায় আমদানি করা তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে এলএনজির দাম কয়েকগুণ বেড়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং বেড়েছে, যা সাধারণ মানুষের ভোগান্তির অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
এই সংকটের সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে শিল্প ও কৃষিখাতে। বিদ্যুতের অভাবে অনেক কারখানায় উৎপাদন কমে গেছে। ছোট ও মাঝারি শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে সমস্যায় পড়েছে। অন্যদিকে সেচকাজে বিদ্যুতের ঘাটতি কৃষি উৎপাদনেও প্রভাব ফেলছে। ফলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
পরিবহন খাতেও জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব স্পষ্ট। ডিজেল ও অকটেনের দাম বাড়ায় বাসভাড়া ও পণ্য পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারে। সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় দিন দিন বাড়ছে, যা মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের জন্য বড় চাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু আমদানিনির্ভরতা বাড়িয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়। দীর্ঘমেয়াদে বিকল্প জ্বালানির দিকে গুরুত্ব দিতে হবে। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এখন সময়ের দাবি। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে পরিবেশবান্ধব জ্বালানির দিকে ঝুঁকছে। বাংলাদেশেও এ বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা গ্রহণ প্রয়োজন।
এছাড়া জ্বালানির অপচয় রোধেও সচেতনতা জরুরি। অপ্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ ব্যবহার কমানো, শক্তি সাশ্রয়ী প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শিল্পখাতে দক্ষ ব্যবস্থাপনা চালু করা গেলে সংকট কিছুটা কমানো সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু সরকার নয়, সাধারণ মানুষকেও জ্বালানি সাশ্রয়ে দায়িত্বশীল হতে হবে।
জ্বালানি সংকট শুধু অর্থনৈতিক সমস্যা নয়; এটি সামাজিক ও উন্নয়নগত চ্যালেঞ্জও। নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি ছাড়া একটি দেশের শিল্প, শিক্ষা, চিকিৎসা ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয়। তাই এই সংকট মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, বিকল্প জ্বালানিতে বিনিয়োগ এবং সচেতন ব্যবহার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বিশ্বের বাস্তবতায় জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন প্রতিটি দেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে ভবিষ্যতে এই সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে টেকসই ও পরিকল্পিত জ্বালানি ব্যবস্থার বিকল্প নেই।
লেখক,সুলতানা আক্তার সম্পা
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর।
জিএ