শামিম হোসেন
প্রকাশ: ০৯:১২, ১১ জুন ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থা গত দুই দশকে সংখ্যাগতভাবে ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। সরকারি ও বেসরকারি মিলিয়ে বর্তমানে দেশে শতাধিক বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে এবং প্রায় ৪৫ লাখ শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষায় যুক্ত। তবে এই বিস্তৃত কাঠামো থাকা সত্ত্বেও গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে দেশ এখনও কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি অর্জন করতে পারেনি। বিশেষজ্ঞদের মতে, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো মূলত পাঠদান ও সনদ প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ, জ্ঞান উৎপাদন ও গবেষণাভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রম সেখানে তুলনামূলকভাবে দুর্বল।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) অনুযায়ী দেশে বর্তমানে ৫৫টির বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় এবং শতাধিক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করলেও গবেষণা কার্যক্রম সেই অনুপাতে বৃদ্ধি পায়নি। ফলে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কার্যকর ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হচ্ছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সূচক SCImago-এর ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশ থেকে আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের সংখ্যা আনুমানিক ১৫ হাজারের কিছু বেশি। একই সময়ে ভারতের প্রকাশনা সংখ্যা প্রায় ২.৫ থেকে ২.৬ লাখ এবং ভিয়েতনামের প্রায় ২৮ হাজারের কাছাকাছি। তুলনামূলক এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে দেখায় যে গবেষণা উৎপাদনের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও অনেক পিছিয়ে।
বিশ্বব্যাংক ও ইউনেস্কো সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ গবেষণা ও উন্নয়ন (R&D) খাতে জিডিপির মাত্র ০.৪ থেকে ০.৫ শতাংশ ব্যয় করে, যেখানে উন্নত ও উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলো গড়ে ২ থেকে ৪ শতাংশ পর্যন্ত ব্যয় করে থাকে। এই বড় ধরনের অর্থনৈতিক ব্যবধান সরাসরি বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের গবেষণা সক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলছে।
২০২২–২৩ অর্থবছরে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর জন্য গবেষণা খাতে মোট বরাদ্দ ছিল প্রায় ১৫৮ কোটি টাকা। দেশের ৫০টিরও বেশি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনায় এই বরাদ্দকে বিশেষজ্ঞরা অত্যন্ত অপ্রতুল বলে অভিহিত করছেন। তাদের মতে, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও উপকরণ নিশ্চিত করতে এই বাজেট যথেষ্ট নয়।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বেশ কয়েকটি পুরনো ও বড় বিশ্ববিদ্যালয়ে এখনও গবেষণাগারের অবকাঠামো আধুনিক মানে উন্নীত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে পুরনো যন্ত্রপাতি ও সীমিত প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে গবেষকদের। উন্নত ডাটা অ্যানালাইসিস টুল, সুপার কম্পিউটিং সুবিধা, জিনোম গবেষণা ল্যাব বা আন্তর্জাতিক মানের ডিজিটাল লাইব্রেরি অনেক প্রতিষ্ঠানে এখনও অনুপস্থিত বা সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।
শিক্ষক সংকটও গবেষণা কার্যক্রমে বড় ধরনের প্রভাব ফেলছে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাত ১:৫০ থেকে শুরু করে কোথাও কোথাও ১:১০০ পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে শিক্ষকরা পাঠদান, প্রশাসনিক দায়িত্ব, পরীক্ষা গ্রহণ এবং কমিটির কাজ সামলাতে গিয়ে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় সময় বের করতে পারছেন না। অনেক ক্ষেত্রে গবেষণা কার্যক্রম ব্যক্তিগত উদ্যোগে সীমাবদ্ধ থেকে যাচ্ছে।
গবেষণা সংস্কৃতির দুর্বলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হিসেবে উঠে এসেছে। অনেক শিক্ষার্থী ও গবেষক গবেষণাকে জ্ঞান সৃষ্টির প্রক্রিয়া হিসেবে না দেখে কেবল ডিগ্রি অর্জনের একটি আনুষ্ঠানিক শর্ত হিসেবে বিবেচনা করেন। ফলে মৌলিক গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প এবং উদ্ভাবনী চিন্তাভাবনার বিকাশ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এছাড়া গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন ও অর্থ ছাড়ের ক্ষেত্রে আমলাতান্ত্রিক জটিলতা একটি বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। একটি গবেষণা প্রকল্প অনুমোদন ও বাস্তবায়নে অনেক সময় ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত সময় লেগে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক জার্নাল ও গবেষণা ডাটাবেজে প্রবেশাধিকারের সীমাবদ্ধতাও গবেষণার মান উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, গবেষণা সংকটের প্রভাব শুধু বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নেও গভীর প্রভাব ফেলছে। জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি উৎপাদন, স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি উদ্ভাবন এবং শিল্পখাতের সমস্যার স্থানীয় সমাধান তৈরি করতে দেশীয় গবেষণার ঘাটতি বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ফলে বাংলাদেশকে অনেক ক্ষেত্রেই বিদেশি প্রযুক্তি ও জ্ঞানের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে।
এছাড়া গবেষণার সীমিত সুযোগ ও দুর্বল অবকাঠামোর কারণে অনেক মেধাবী শিক্ষক ও গবেষক বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। এই প্রবণতাকে বিশেষজ্ঞরা ‘ব্রেইন ড্রেইন’ হিসেবে উল্লেখ করছেন, যা দীর্ঘমেয়াদে দেশের গবেষণা সক্ষমতাকে আরও দুর্বল করে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য গবেষণা খাতে বাজেট উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা প্রয়োজন। পাশাপাশি আধুনিক ল্যাবরেটরি স্থাপন, গবেষণায় আর্থিক ও প্রাতিষ্ঠানিক প্রণোদনা প্রদান, শিক্ষক–শিক্ষার্থী অনুপাত যৌক্তিক করা এবং শিল্প–বিশ্ববিদ্যালয় অংশীদারিত্ব জোরদার করা জরুরি। তাদের মতে, গবেষণাকে শিক্ষাব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত করতে না পারলে জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্বায়নের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে কেবল ডিগ্রি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং জ্ঞান, গবেষণা ও উদ্ভাবনের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। অন্যথায় উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থার বিস্তার সত্ত্বেও দেশের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।
শামিম হোসেন
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় রংপুর