মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরে প্রয়োজন কয়েক ধাপ, যা আছে প্রচলিত আইনে

রবিউল আলম

প্রকাশ: ১৫:৩৪, ৮ জুন ২০২৬

মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকরে প্রয়োজন কয়েক ধাপ, যা আছে প্রচলিত আইনে

ছবি: সংগৃহীত

সাধারণ নিয়মে আদালত বা ট্রাইব্যুনালে বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ হলে রায় ঘোষণা করা হয়। যা আসামিপক্ষ কিংবা বাদীপক্ষ রায় পেয়ে থাকেন। বাংলাদেশে বহুল আলোচিত এবং সর্বোচ্চ দণ্ড হচ্ছে— ‘মৃত্যুদণ্ড’। তবে অনেক দেশে মৃত্যুদণ্ডকে মানবাধিকার লঙ্ঘন হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। সম্প্রতি কয়েকটি আলোচিত মামলার মধ্যে ‘রামিসা ধর্ষণকাণ্ড’ মামলা অন্যতম।

বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন রায়। খুব দ্রুত রায় ঘোষণায় ইতিবাচক প্রভাবও পড়ছে জনমনে এবং আদালতের প্রতি আস্থা বাড়ছে জনগণের। তবে এখনও সম্পন্ন হয়নি আইনি লড়াই। এমন রায়ের ক্ষেত্রে বিচারিক আদালত বা ট্রাইব্যুনালে দেওয়া দণ্ড কার্যকর করতে একাধিক বাধ্যতামূলক আইনি ধাপ অতিক্রম করতে হয়। দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম শেষে মামলাটি এখন উচ্চ আদালতে বিচারিক পর্যালোচনার পর্যায়ে প্রবেশ করবে। যেখানে ডেথ রেফারেন্স, আপিল ও রিভিউ শুনানি এবং প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন প্রক্রিয়া শেষে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাবে। সব শেষে মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে তা কার্যকর করা সম্ভব হবে, অন্যথায় রায় কার্যকর সম্ভব নয়।

আপিল করার অধিকার

ট্রাইব্যুনাল বা আদালত রায় ঘোষণার পর আসামিপক্ষকে উচ্চ আদালতে যাওয়ার জন্য প্রচলিত আইন সাতদিনের সময় দিয়েছে। সাতদিনের মধ্যে আসামিরা চাইলে জেল আপিল অথবা নিয়মিত আপিল করতে পারবেন। এটি তাদের আইনগত অধিকার। মৃত্যুদণ্ডের মামলার ক্ষেত্রে আসামির আপিলের পাশাপাশি বিচারিক আদালতের দেওয়া সাজার রায়ও উচ্চ আদালতের পর্যালোচনার জন্য যাবে। উচ্চ আদালত সেগুলো পর্যালোচনা করে সিদ্ধান্ত নিবে।

ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPC) ১৮৯৮ সালের ৪১০ ধারা অনুযায়ী, দায়রা জজ বা অতিরিক্ত দায়রা জজ কর্তৃক প্রদত্ত কোনো দণ্ডাদেশ বা সাজার রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করা যায়। এক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধেও হাইকোর্টে আপিল করার সুযোগ দিয়েছে এই আইন।

হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স শুনানি

নিম্ন আদালত বা ট্রাইব্যুনাল কোনো আসামিকে মৃত্যুদণ্ড দিলে সেই রায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে হাইকোর্ট বিভাগে পাঠাতে হয়। এই প্রক্রিয়াকে ‘ডেথ রেফারেন্স’ বলা হয়।

ফৌজদারি কার্যবিধি (CrPc) ৩৭৪ ধারা মতে, বিচারিক আদালত মৃত্যুদণ্ড প্রদান করলে তা কার্যকর করার আগে হাইকোর্ট বিভাগের অনুমোদন বাধ্যতামূলক। হাইকোর্ট রায় অনুমোদন না করা পর্যন্ত দণ্ড কার্যকর করার কোনো সুযোগ নেই।

ডেথ রেফারেন্স শুনানিতে হাইকোর্ট শুধু রায় দেখেন না। মামলার পুরো বিচারিক কার্যক্রম যেমন—সাক্ষ্য-প্রমাণ, ফরেনসিক প্রতিবেদন, ডিএনএ প্রতিবেদন, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন, সাক্ষীদের জবানবন্দি ও সংশ্লিষ্ট আদালতের পর্যবেক্ষণ- সবকিছু পর্যালোচনা করেন। যা নিম্ন আদালতের রায়ের উপর নজরদারি হিসেবে পরিচিত।

ডেথ রেফারেন্সের শুনানি শেষে হাইকোর্ট কয়েক ধরনের সিদ্ধান্ত দিতে পারেন। চাইলে ট্রাইব্যুনালের দেওয়া মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখতে পারেন। আবার পরিবর্তন করে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা অন্য কোনো সাজাও দিতে পারেন। এরপর যাবে আপিল বিভাগ।

আপিল বিভাগে দ্বারস্থ ও রিভিউ

হাইকোর্টের রায়ের বিরুদ্ধে দণ্ডিত ব্যক্তি আপিল বিভাগে আপিল করার আইনি অধিকার রাখেন। আপিল বিভাগেও মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকলে, সংবিধানের ১০৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী উক্ত রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করা যায়। এটি আইন প্রক্রিয়ার চূড়ান্ত রূপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আপিল আদালত চাইলে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখতে পারে কিংবা পরিবর্তন করতে পারেন। এই আইনি প্রক্রিয়াগুলো চলাকালীন দণ্ড কার্যকর করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা

সকল আইনি প্রক্রিয়া শেষে মৃত্যুদণ্ডাদেশ চূড়ান্ত হলে, সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী দণ্ডিত ব্যক্তি রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণ-ভিক্ষা চাইতে পারেন। যা আইনি ভাষায় মার্সি পিটিশন বলা হয়। রাষ্ট্রপতি এই আবেদন মঞ্জুর বা নাকচ না করা পর্যন্ত বা ক্ষমা না করা পর্যন্ত ফাঁসি কার্যকর করার কোনো আইনি বৈধতা থাকে না।

বাংলাদেশ সংবিধানের ৪৯ অনুচ্ছেদে বলা হয়, ‘কোন আদালত, ট্রাইব্যুনাল বা অন্য কোন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক প্রদত্ত যে−কোন দণ্ডের মার্জনা, বিলম্বন ও বিরাম মঞ্জুর করিবার এবং যে−কোন দণ্ড মওকুফ, স্থগিত বা হ্রাস করিবার ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির থাকিবে।’

চূড়ান্ত দণ্ড কার্যকর:

নিম্ন-উচ্চ আদালত ও বিচারিক এবং সাংবিধানিক সব প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার সুযোগ নেই। হাইকোর্টের ডেথ রেফারেন্স, আপিল বিভাগে আপিল ও রিভিউ আবেদন এবং প্রাণভিক্ষা সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত- সব কিছু সম্পন্ন হওয়ার পরই দণ্ড কার্যকরের আইনগত পথ উন্মুক্ত হবে। এর পর রাষ্ট্রীয়ভাবে একজন দণ্ডিত ব্যক্তিকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলিয়ে চূড়ান্ত রায় কার্যকর করা হয়।

রবিউল আলম 
গণমাধ্যম কর্মী ও শিক্ষার্থী, আইন ও ভূমি প্রশাসন 
ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় (কুষ্টিয়া)
[email protected]

জিএ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন