ঢাকার দিনলিপি: পাখির চোখে নগরায়ন ও বর্ষার আগমনী বার্তা 

মো. হাবিবুর রহমান

প্রকাশ: ১৯:৩৮, ২১ জুন ২০২৬

ঢাকার দিনলিপি: পাখির চোখে নগরায়ন ও বর্ষার আগমনী বার্তা 

ছবি: সংগৃহীত

বর্ষাকাল আরম্ভ হওয়ার পূর্বে গত কয়েকদিন যাবৎ ঢাকা শহর ও বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে তুমুলভাবে বৃষ্টি ও বজ্রপাত হয়েছে। ইংরেজিতে একটি প্রবাদ আছে,  Morning shows the day"। হয়তো এবারের বর্ষাকাল আমাদের জন্য তেমন একটা সুখকর হবে না। যদিও প্রতি বছর বন্যা ও অন্যান্য পানি বাহিত রোগ ব্যাধি নানাভাবে আমাদের জন্য সমস্যা সৃষ্টি করে থাকে। আষাঢ় মাস নতুন করে আমাদের চিত্তে নাড়া দিচ্ছে। এ আষাঢ়কে বরণ করে নেওয়ার জন্য প্রকৃতি নতুনভাবে সেজেছে। 

ঢাকার নামের মধ্যেই রহস্য লুকায়িত। ঢাকা যেন নিজেকে লুকাতে চায়। যদিও মানব সমাজ তাকে গোপন রাখে না। ঢাকাকে দেখা যেন প্রিয়ার সৌন্দর্য অবলোকনের মত। যেমন কবি কাজী নজরুল ইসলাম বলেছেন, "আমি গোপন প্রিয়ার চকিত চাহনি, ছল করে দেখা অনুখন।" কিশোর বয়সের ঢাকা আর বর্তমান ঢাকা এক নয়। ঢাকার বয়স অনেক হলেও সৌন্দর্য ও রূপ বেড়েছে? নাকি কমেছে? তা অননুমেয়। ঢাকা চতুঃশতবার্ষিকীর অধিককাল অতিক্রম করেছে।  মুঘল সম্রাট জাহাঙ্গীর এর ফরমান অনুযায়ী ১৬১০ খ্রিস্টাব্দে ১৬ জুলাই ঢাকাকে "সুবাহ বাংলার" রাজধানী ঘোষণা করা হয়। তবে এ নগরী ঢাকার কবে গোড়াপত্তন হয়েছে? তা নিয়ে গবেষক ও ঐতিহাসিকদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে। ঢাকা কি আসলেই আধুনিকতার ছোঁয়া পেয়েছে? নাকি নগরায়ণের কবলে গিয়ে ঢাকা তার স্বরূপ হারিয়েছে? এগুলো নিয়ে সমালোচক ও গবেষকদের আলোচনার অন্ত নেই। ঢাকা শহরে প্রতিনিয়ত যেমন লোকসংখ্যা বাড়ছে, তেমনি নগরের সুবিধা ও সুযোগ সংকুচিত হচ্ছে। যানজট, জলাবদ্ধতা, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ, নিরাপদ পানির অভাব, পরিবেশের অবক্ষয় ইত্যাদি নিত্য নৈমিত্তিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। 

ঢাকার প্রশাসনিক ও সাংস্কৃতিক বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের অপরিহার্য অনুষঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে। ঢাকা কথা স্মরণ হলে আমাদের স্মৃতিতে নানা আলপনা ও চিত্র ভেসে ওঠে। এটা কখনো রিক্সার শহর, কখনো মসজিদের শহর, কখনো যানজটের শহর, কখনো ইতিহাস ও ঐতিহাসিক নিদর্শনের শহর, ভাঙা ও গড়ার শহর এবং এটা রঙিন শহর হিসেবে আমাদের চিত্তকে নাড়া দেয়। সবশেষে এটা বাংলাদেশের রাজধানী হিসেবে খ্যাত। কিন্তু পাখির চোখে ঢাকা যেন অপরিকল্পিত নগরী। বিহঙ্গের দৃষ্টিতে ঢাকা যেন মেঘের শহর। একটা ইমারত আরেকটার সাথে অনায়াসে মিশে আছে। মনে হয়, একে অপরের ওপরে হেলান দিয়ে আছে। যদিও নতুন আবাসন প্রকল্প ও কিছু ইমারত এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। এটা এমন একটা শহর, যেখানে মানুষের পক্ষে নিরাপদ অক্সিজেন নেওয়া দুষ্কর, তেমনি পাখির বসবাসের স্থান খুঁজে পাওয়া দুরূহ। পোড়ামাটি ও পাথরে গড়ে উঠেছে সুরম্য অট্টালিকা। টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশ বান্ধব চিত্র পাওয়া কষ্টকর। ঢাকা ও আশেপাশের অঞ্চলে মানবিক ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের সম্মুখীন হলে তা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। ঢাকাকে বসবাসের উপযোগী ও মানানসই হিসেবে গড়ে তুলতে ইতোমধ্যে নানা কর্মসূচি ও উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সম্প্রতি (১৫/৬/২৬) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ঢাকায় অভ্যন্তরীণ যানজট সংক্রান্ত সংকট দূর করতে নগরীর ভেতর থেকে সায়দাবাদ, গুলিস্তান, গাবতলী এবং মহাখালী বাস টার্মিনালের বাস ডিপো পর্যায়ক্রমে প্রান্তিক /উপযুক্ত স্থানে স্থানান্তরের বিষয়ে উদ্যোগ নিতে নির্দেশ দিয়েছেন। এটা নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ও ব্যতিক্রমি পদক্ষেপ। তবে এটা বাস্তবায়নে কিছুটা চ্যালিঞ্জং বিধায় সবার সহযোগিতা প্রয়োজন। এ পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে পারলে রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং যানজট সমস্যার সমাধান সম্ভব।

মেঘ ও বৃষ্টির পানিতে দুষ্টামি করা, কারো কাছে রোমান্টিকতা ও মন ছুঁয়ে যাওয়ার গল্পের মত। কেউ বা ক্ষণিকের একটু স্মৃতি আজীবন বয়ে বেড়ায়। আবার কারো কাছে তা বিভীষিকার নামান্তর। অনেকে এ কষ্টের স্মৃতি সুখের সময় উল্লাসে স্মরণ করে। কাউকে বৃষ্টির সময় ভেজে দৈনন্দিন কার্যক্রম পরিচালনা করতে হয়। আবার কেউ খোলা আকাশের নিচে বসবাস করতে হয় বিধায় বৃষ্টির টইটম্বুর পানিতে জীবন সংগ্রাম চালিয়ে নিতে হয়। যাদের চার চাকা নেই, তাঁদের মাথায় বৃষ্টির পানিতে ভেজে যায়। বিশেষ করে উবার, কিংবা পাঠাও রাইড শেয়ারিং এর সময় বাইকের চালকের জন্য বৃষ্টির পানি দুর্ভোগ ঢেকে আনে। এছাড়াও শ্রমজীবী ও অন্যান্য মানুষের জন্য কষ্টের শেষ নেই।

বৃষ্টি ও মেঘ নিয়ে সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে নানা গল্প রয়েছে। W. H. Davies তাঁর The Rain কবিতায় বলেন, "I hear leaves drinking rain" (আমি বৃষ্টির সময় গাছের পাতার শব্দ শুনি)।” আষাঢ়ের সৌন্দর্য মূলত প্রকৃতি ও পরিবেশে নানান আলপনায় উপলব্ধি করা যায়। কদম ফুল, বৃষ্টিতে ভেজা, চায়ের আড্ডা,  মুড়ি ও চানাচুর খাওয়া, বাদাম খাওয়া, কফির অর্ডার নিয়ে অপেক্ষা করা ইত্যাদি প্রেক্ষাপটে আষাঢ় মাস অনেকের কাছে চির স্মরণীয়।

বর্ষায় মেঘের রূপ ও সৌন্দর্যের বর্ণনায় নজরুল সঙ্গীত অত্যন্ত সুন্দরভাবে উপস্থাপিত হয়েছে। যেমন, "ছড়ায়ে বৃষ্টির বেলফুল, দুলায়ে মেঘলা চাঁচর চুল/চপল চোখে কাজল মেঘে আসিল কে॥বাজায়ে মেঘের মাদল/ভাঙালে ঘুম ছিটিয়ে জল,
একা-ঘরে বিজলিতে এমন হাসি হাসিল কে॥এলে কি দুরন্ত মোর ঝোড়ো হাওয়া,চির-নিঠুর প্রিয় মধুর পথ-চাওয়া।হৃদয়ে মোর দোলা লাগে ঝুলনেরই আবেশ জাগে, ফেলে-যাওয়া বাসি মালায় ─ আবার ভালোবাসিল কে॥" অন্যান্য কবি ও সাহিত্যিকগণ আষাঢ় ও বৃষ্টি নিয়ে নানা কর্ম রচনা করেছেন, যা পাঠক ও প্রিয় মানুষের মনে নাড়া দেয়।

ঢাকা সমস্যা অনেক। এ ঢাকা শহরের বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য বর্তমান সরকারকে সিটি কর্পোরেশন, ওয়াসা, রাজউক, এবং সড়ক ও পরিবহন কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় সাধন সাপেক্ষে পলিসি বাস্তবায়নের দিকনির্দেশনা দিতে হবে। অন্যদিকে ঢাকাকে বসবাসযোগ্য, নিরাপদ, পরিবেশবান্ধব এবং দীর্ঘমেয়াদী টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে নদ নদী, জলাশয় এবং জীববৈচিত্র্যকে আমলে নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। ঢাকা নগরীর প্রধান নদী যথাক্রমে বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ এবং বালু নদীর নাব্যতা ফিরে আনা এবং দূষণ কমাতে হবে। এছাড়াও এ সকল নদীর পানিতে কেমিক্যাল ও শিল্পায়নের বর্জ্য যাতে না পড়ে সেজন্য পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। পরিবেশ দূষণ কমিয়ে আনাও অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। নিরাপদ পানি সংকট দূরীভূত, এবং টেকসই পরিবেশের জন্য পরিকল্পিত বৃক্ষরোপন কর্মসূচি চালিয়ে যেতে হবে। পাখি ও জীববৈচিত্র্যের বসবাসের জন্য পাখির বাসা নির্মাণ (প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম) ও অভয়ারণ্য গড়ে তুলতে নগরবিদ, প্রকোশলী ও স্থাপত্যবিদকে ইমারতে যাতে আলাদা ব্যবস্থা রাখা হয়, সেজন্য খেয়াল রাখতে হবে। কারণ এটা পরিবেশের ভারসাম্যের জন্য একান্ত প্রয়োজন।

ঢাকা বিভিন্ন খাল ও জলাশয় যথাক্রমে রায়েরবাজার খাল, মোহাম্মদপুরের বছিলায় মৃত লাউতলা খাল সচল করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিলে বজ্য ব্যবস্থাপনা ও দূষণ কমে আসবে। ঢাকা শহরে প্রায় ৬৫-৫৬টি খাল বিভিন্নভাবে অকার্যকর ও মৃত অবস্থায় রয়েছে। এগুলো পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হলে ঢাকা দূষণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনা স্বাভাবিক হয়ে আসবে। নগরবিদ, গবেষক, পরিকল্পনাবিদ, এবং বিজ্ঞানীদের পরামর্শ অনুযায়ী ঢাকা শহরের সমস্যা সমাধানের জন্য সরকারেক নির্মোহভাবে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে উপর্যুক্ত ৬৫-৫৬টি খালের মধ্যে মাত্র ২৩টি এখন কার্যকর ও সচল রয়েছে। যা ঢাকার দূষণ, ময়লা, আবর্জনা নিষ্কাশনে পর্যাপ্ত নয়। তাই এগুলো সচল করে এ সমস্যার সমাধান করা প্রয়োজন। অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক হলো, স্থানীয় সরকার বিভাগ কর্তৃক ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় সকল খালের সীমানা নির্ধারণ ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রমকে গতিশীল করতে যে দুটি কমিটি গঠন করা হয়েছে, তা সক্রিয়ভাবে কাজ করলে এ সমস্যা সমাধান হবে।

ঢাকার বর্তমান বহুমূখী সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য সরকার ও জনগণের মধ্যে সদ্দিচ্ছা থাকা একান্ত প্রয়োজন। ঢাকাকে নিরাপদ ও ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য বসবাস উপযোগী করার জন্য আমাদের সবাইকের সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে। নাগরিক দায়িত্ব সুন্দরভাবে পালন করলে ঢাকা নিরাপদ ও বসবাসের উপযোগী শহর হিসেবে গড়ে উঠবে

লেখক,
মো. হাবিবুর রহমান, কবি, গবেষক ও বিশ্লেষক

জিএ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন