মংক্যএ মার্মা
প্রকাশ: ১৪:২১, ২ জুন ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে যখন চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাদা মেঘের বিশাল সমুদ্র, তখন মনে হয় প্রকৃতি যেন তার সবচেয়ে সুন্দর ক্যানভাসটি খুলে দিয়েছে। বান্দরবানের আলীকদমের মারাইংতং পাহাড় ও ডিম পাহাড় ঠিক তেমনই এক বিস্ময়ের নাম, যেখানে প্রকৃতি, সংস্কৃতি এবং পাহাড়ি জনপদের জীবনধারা মিলেমিশে তৈরি করেছে এক অনন্য সৌন্দর্য।
বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি জনপদ আলীকদম বহুদিন ধরেই পরিচিত তার সবুজ পাহাড়, আঁকাবাঁকা সড়ক এবং মেঘে মোড়া প্রাকৃতিক পরিবেশের জন্য। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মারাইংতং পাহাড় ও ডিম পাহাড় আবারও বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে মেঘ ছোঁয়ার অভিজ্ঞতা আর অপার্থিব সৌন্দর্যের কারণে। ভোরের আলো ফোটার আগেই পাহাড়চূড়ায় জড়ো হতে শুরু করে মেঘের দল। সূর্যের প্রথম কিরণ যখন সেই মেঘের ভেলায় এসে পড়ে, তখন পুরো পাহাড়ি অঞ্চল যেন রূপ নেয় এক স্বপ্নলোকের।
মারাইংতং পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়ালে চারদিকে যতদূর চোখ যায়, দেখা মেলে আঁকাবাঁকা মাতামুহুরি নদী আর সবুজ পাহাড়ের সারি। শীত, বর্ষা ও বর্ষা পরবর্তী সময়ে পাহাড়গুলোর গা বেয়ে নেমে আসে সাদা মেঘের আস্তরণ। কখনো মেঘ এতটাই কাছে চলে আসে যে মনে হয় হাত বাড়ালেই ছুঁয়ে ফেলা যাবে। প্রকৃতির এই অনন্য দৃশ্য দেখতে শীত, বর্ষা এবং বর্ষা পরবর্তী সময়ে ভিড় করেন অসংখ্য দর্শনার্থী।
তবে মারাইংতং পাহাড়ের সৌন্দর্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হলো সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১,৬৪০ ফুট উচ্চতার এ পাহাড়ে ওঠার পর এখানকার প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার ও ধর্মীয় ঐতিহ্য। পাহাড়ের চূড়ায় নির্মিত ছোট বৌদ্ধ বিহারটি শুধু উপাসনার স্থান নয়, বরং পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি ও জীবনাচারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
দূর থেকে দেখা যায় বৌদ্ধ বিহারের সোনালি চূড়া আর বৌদ্ধ পতাকার রঙিন শোভা, যা পাহাড়ের সবুজের সঙ্গে এক অপূর্ব বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। পাহাড়ের গায়ে দাঁড়িয়ে থাকা বৌদ্ধ বিহারগুলো শুধু ধর্মীয় স্থাপনা নয়; এগুলো পাহাড়ি জনপদের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং জীবনবোধেরও নীরব সাক্ষী। প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের পাশাপাশি এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য আলীকদমকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র পরিচয়।
আশপাশের স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীরা ভোরবেলা বৌদ্ধ বিহারে এসে প্রার্থনায় অংশ নেন। বিহার থেকে ভেসে আসে প্রার্থনার মৃদু সুর, যা পাহাড়ি বাতাসে ছড়িয়ে পড়ে মেঘে মোড়া পাহাড় আর সকালের নিস্তব্ধতার সঙ্গে সেই সুর মিলে সৃষ্টি করে এক শান্ত, স্নিগ্ধ ও আধ্যাত্মিক পরিবেশ।
অন্যদিকে আলীকদম-থানচি সড়কের সবচেয়ে আকর্ষণীয় স্থানগুলোর একটি ডিম পাহাড়। পাহাড়টির নামকরণ হয়েছে এর ডিম্বাকৃতির গঠন থেকে। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,৫০০ ফুট উচ্চতায় অবস্থিত এ স্থানটি বাংলাদেশের অন্যতম উঁচু সড়কপথের অংশ।
ডিম পাহাড়ে পৌঁছানোর পথে দেখা মেলে অসংখ্য বাঁক, খাড়া উত্থান এবং গভীর পাহাড়ি উপত্যকা। অনেক পর্যটক শুধু এই সড়কপথের সৌন্দর্য উপভোগ করতেই আলীকদমে আসেন। ভোর বা বিকেলে এখানে দাঁড়ালে মনে হয় মেঘগুলো হাত বাড়ালেই ছোঁয়া যাবে। শীত ও বর্ষার পরবর্তী সময়ে আঁকাবাকা পথগুলোতে মেঘগুলো নেমে এসে এক অপরুপ সৌন্দর্য এনে দেয়। পাহাড়টির চূড়ায় দাঁড়িয়ে দেখা যায় পাহাড়ি সড়কের দীর্ঘ আঁকাবাঁকা পথ, গভীর উপত্যকা এবং দূরে নীলাভ পাহাড়ের সারি।
দিনের বিভিন্ন সময়ে আলোর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যায় পাহাড়ের রূপ। কখনো কুয়াশা, কখনো মেঘ, আবার কখনো সোনালি সূর্যালোক— প্রকৃতি যেন প্রতিটি মুহূর্তে নতুন এক চিত্র এঁকে চলে।
দিনের শেষে সূর্য যখন পশ্চিম আকাশে হারিয়ে যায়, তখন মারাইংতং ও ডিম পাহাড়ের আকাশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে লালচে-কমলা আভা। পাহাড়ের বুক জুড়ে নেমে আসে নীরবতা। দূরে কোনো বৌদ্ধ বিহারের ঘণ্টাধ্বনি আর পাহাড়ি বাতাসের মৃদু শব্দ মিলেমিশে যেন বলে যায় এই জনপদের গল্প— যেখানে মেঘ শুধু আকাশে ভাসে না, নেমে আসে মানুষের খুব কাছাকাছি; যেখানে পাহাড় শুধু প্রকৃতির সৃষ্টি নয়, বরং সংস্কৃতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যেরও এক জীবন্ত প্রতীক।
আলীকদমের মারাইংতং ও ডিম পাহাড় তাই কেবল পর্যটনকেন্দ্র নয়; এটি এমন এক ভূখণ্ড, যেখানে প্রকৃতির সৌন্দর্য, পাহাড়ি সংস্কৃতি এবং বৌদ্ধ ঐতিহ্য একসঙ্গে মিলে তৈরি করেছে বাংলাদেশের অন্যতম মনোমুগ্ধকর ও বৈচিত্র্যময় এক পাহাড়ি জনপদ।
জিএ