লক্ষ্মীপুর

নতুন ৫৭ সার ডিলারের তালিকায় ৪৫ জনই বিএনপির নেতা-কর্মী, বাদ পুরোনো ব্যবসায়ীরা

টিএনএন ডেস্ক

প্রকাশ: ২০:৩৯, ২২ অক্টোবর ২০২৬

নতুন ৫৭ সার ডিলারের তালিকায় ৪৫ জনই বিএনপির নেতা-কর্মী, বাদ পুরোনো ব্যবসায়ীরা

ছবি: সংগৃহীত

লক্ষ্মীপুরে নতুন করে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত ৫৭ জনের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাদের কয়েকজনের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সার বিক্রি করেও ডিলারশিপ না পাওয়ার অভিযোগ করেছেন কয়েকজন আবেদনকারী। তাদের দাবি, দলীয় প্রভাবের কারণে কিছু ব্যক্তি ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তবে এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট বিএনপি নেতারা।

সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এ কারণে মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয় ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বাদ পড়া কয়েকজন আবেদনকারী।

লক্ষ্মীপুর জেলার ৫৮টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভার জন্য সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হয়। গত ১০ সেপ্টেম্বর ছিল আবেদনের শেষ দিন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মোট ৩৩৬টি আবেদন জমা পড়ে।

গত ৭ অক্টোবর কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার কৃষি অর্থনীতিবিদ শাহনাজ আক্তারের সই করা চিঠিতে ৫৭ জনকে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে অন্তত ৪৫ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। তাদের কেউ বিএনপির বিভিন্ন পদে রয়েছেন, কেউ ছাত্রদল, যুবদল কিংবা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা। কয়েকজন দলটির সক্রিয় কর্মী। এ ছাড়া দলীয় নেতাদের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্ক রয়েছে, এমন ব্যক্তিও আছেন তালিকায়। তবে বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেও বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তি রয়েছেন।

সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা হওয়া এবং সেটি স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে থাকা বাধ্যতামূলক। ওই গুদামে খাদ্যপণ্য, রেস্তোরাঁর সামগ্রী, গবাদিপশু ও মাছের খাবার কিংবা সবজি রাখা যাবে না। একই গুদামে বীজ সংরক্ষণও নিষিদ্ধ।

এ ছাড়া আবেদনকারীকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে এবং ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে। নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও রয়েছে।

রায়পুর উপজেলার দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল আজিজ। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা যায়, তার প্রতিষ্ঠান মেসার্স গাজী এন্টারপ্রাইজ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিল না।

রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশের প্রতিষ্ঠান মেসার্স ফাল্গুনী এন্টারপ্রাইজও ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিরও আগে সার ব্যবসা ছিল না বলে জানা গেছে।

রায়পুর উপজেলার কেরোয়া ইউনিয়নে মেসার্স হাসিনা এন্টারপ্রাইজের মালিক মেহেদী হাসান আইনানকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি রায়পুর উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক। তারও আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না।

বামনী ইউনিয়নে মেসার্স আমির হোসেন এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী আমির হোসেন ওরফে ছুটু ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি। তিনিও এবার নতুন করে সার ব্যবসায় যুক্ত হচ্ছেন।

উত্তর চর আবাবিল ইউনিয়নে মায়ের দোয়া এন্টারপ্রাইজের মালিক মো. মাসুদ মিয়াকে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি লক্ষ্মীপুর জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক। চরমোহনা ইউনিয়নে ভূঁইয়া ট্রেডার্সের মালিক ফাহিম ভূঁইয়া ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি। তারও আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার দালাল বাজার ইউনিয়নে মেসার্স সততা ট্রেডার্সের মালিক জাকির হোসেনকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করা হয়েছে। তিনি ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি। তার প্রতিষ্ঠান মূলত রড, সিমেন্ট ও নারকেলের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

রামগঞ্জ উপজেলার নোয়াগাঁও ইউনিয়নে মেসার্স আবদুল্লাহ ট্রেডার্সের মালিক মো. বিল্লাল পাটোয়ারী মনোনীত হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক। করপাড়া ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আহসান হাবিবের প্রতিষ্ঠান এস বি ট্রেডার্স। ভোলাকোট ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন যুবদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক হাফেজ আহম্মদ।

কমলনগর উপজেলার সাহেবেরহাট ইউনিয়নে ইয়ামিন ট্রেডার্সের মো. ইসমাইল ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন। তিনি ওই ইউনিয়ন যুবদলের আহ্বায়ক হেলাল উদ্দিনের ভাই। চর মার্টিন ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন।

চর ফলকন ইউনিয়নে মনোনীত মাহবুবুর রহমান উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর আত্মীয় বলে জানা যায়। তার চাচাতো ভাই লোকমান হোসেন পাটারীর প্রতিষ্ঠানও পাটারীরহাট ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছে।

হাজিরহাট ইউনিয়নে মনোনীত হয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইসমাইল হোসেন। চর কাদিরা ইউনিয়নে মনোনয়ন পেয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক বোরহান উদ্দিনের ছোট ভাই হেলাল উদ্দিন। তাদের কেউ আগে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলে জানা যায়।

চন্দ্রগঞ্জ বাজারে ২০০২ সাল থেকে সার বিক্রি করছেন মো. শোভন। এবার ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করলেও চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই। শোভনের অভিযোগ, দীর্ঘদিন সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও তিনি ডিলারশিপ পাননি।

তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সারের ব্যবসা করেও ডিলারশিপ পাইনি। সব নিয়মকানুন মেনে আবেদন করেছি। কিন্তু আমার রাজনৈতিক পরিচয় না থাকায় ডিলার হতে পারলাম না।

চর কাদিরা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও ইউনিয়ন যুবদলের নেতা শাহেদ হাওলাদারও ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থাকলেও চূড়ান্ত তালিকায় তার নাম নেই।

শাহেদ হাওলাদার বলেন, সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসা থাকার বিষয়টি ছিল। আমি এক যুগ ধরে এলাকায় সারের ব্যবসা করছি। কিন্তু আমাকে নিয়োগ দেওয়া হয়নি। নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এমন একজনকে, যিনি আগে কখনো সারের ব্যবসা করেননি। এটি দুঃখজনক ও হতাশাজনক।

কমলনগর উপজেলার চর মার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান ও উপজেলা যুবদলের সদস্য তারেক রহমান ওরফে রকিও ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করেছিলেন। তার দাবি, তাদের পরিবার প্রায় ৫০ বছর ধরে সার ও কীটনাশকের ব্যবসা করছে। তাদের প্রতিষ্ঠান আগে সার ডিলার হিসেবে কাজ করলেও পরে ডিলারশিপ বাতিল হয়। এবার আবেদন করেও তিনি মনোনীত হননি।

তারেক রহমান অভিযোগ করেন, কয়েকজন মনোনীত ব্যক্তির পর্যাপ্ত গুদাম নেই, এমনকি তাদের অনেকের সার বিক্রির অভিজ্ঞতাও নেই। এতে প্রকৃত সার ব্যবসায়ীরা ব্যবসার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। তিনি কমলনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি নুরুল হুদা চৌধুরীর বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে ডিলার নিয়োগের অভিযোগও তোলেন।

তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নুরুল হুদা চৌধুরী। তিনি বলেন, সার ডিলার নিয়োগে দলীয়ভাবে তারা কোনো হস্তক্ষেপ করেননি; সবাই নিজ নিজ যোগ্যতায় মনোনীত হয়েছেন।

তালিকায় থাকা দুজনের সঙ্গে তার আত্মীয়তার সম্পর্কের বিষয়ে নুরুল হুদা চৌধুরী বলেন, পাটারীরহাট ইউনিয়নের লোকমান হোসেন তার দূরসম্পর্কের চাচাতো ভাই। অন্যদিকে, চর ফলকন ইউনিয়নের মাহবুবুর রহমানকে তার ভাগনে বলা হলেও সেটি সত্য নয় বলে দাবি করেন তিনি। মাহবুবুর রহমান আগে ছাত্রদল করতেন, বর্তমানে যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত বলেও জানান নুরুল হুদা চৌধুরী।

তিনি আরও বলেন, আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা নীতিমালা অনুযায়ী অগ্রাধিকার পাবেন—এমন প্রত্যাশা তাদেরও ছিল।

দক্ষিণ চরবংশী ইউনিয়নের ডিলার হিসেবে মনোনীত আমিনুল আজিজ বাদশা রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘‘রাজনৈতিক বিবেচনায় ডিলার নিয়োগ দেওয়া হয়নি। আমি যথাযথ কাগজপত্র জমা দিয়ে ডিলারের জন্য মনোনীত হয়েছি।’’

রামগঞ্জ পৌর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন ওরফে পলাশ বলেন, এখানে সারের চাহিদা কম। তারপরও ডিলারশিপ নিয়েছি। এর জন্য রাজনৈতিক কোনো তদবির ছিল না।

বামনী ইউনিয়নের মনোনীত ডিলার আমির হোসেন ওরফে ছুটু বলেন, আগে অনেক ব্যবসা করেছি। সার ব্যবসায় এবার নতুনভাবে যুক্ত হচ্ছি। নিজের যোগ্যতা বলেই মনোনীত হয়েছি।

কমলনগর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্যসচিব মো. গিয়াস উদ্দিন জানান, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর কর্তৃপক্ষ যাচাই-বাছাই করে তাকে মনোনীত করেছে। তবে তিনি আগে কখনো সার ব্যবসা করেননি বলে স্বীকার করেন।

লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. ইকবাল বলেন, আমার ইউনিয়নে অন্য কেউ আর আবেদন করেননি। আমি একমাত্র আবেদনকারী ছিলাম। সার্বিক বিচারে আমাকে ডিলার হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে।

ডিলার নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও লক্ষ্মীপুরের জেলা প্রশাসক এস এম মেহেদী হাসানের বক্তব্য জানতে তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। তিনি ফোনে কথা না বলে বার্তা পাঠাতে বলেন। পরে বার্তা পাঠানো হলেও তিনি কোনো জবাব দেননি।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ও জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব জহির আহমেদ বলেন, তালিকায় বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সংখ্যা বেশি—এমন তথ্য তিনিও জেনেছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি আবেদন যাচাই-বাছাই করে সুপারিশসহ তালিকা পাঠিয়েছিল। পরে সেই তালিকা কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় এবং মন্ত্রণালয় চূড়ান্ত তালিকা তৈরি করে।

জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মো. হাছিবুর রহমান বলেন, গত ১৭ বছর দলের নেতা-কর্মীরা সার ডিলারশিপসহ বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত ছিলেন। এখন তারা ব্যবসা-বাণিজ্যে মনোযোগী হয়ে আবেদন করছেন। তার দাবি, আবেদনকারীরা নিয়ম মেনেই আবেদন করেছেন এবং ডিলার মনোনয়নে দলের কোনো প্রভাব ছিল না।

লক্ষ্মীপুরে সার ডিলার নিয়োগের তালিকা ঘিরে দীর্ঘদিনের ব্যবসায়ীদের বাদ পড়ার অভিযোগের পাশাপাশি মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা এবং নিয়োগপ্রক্রিয়ায় যোগ্যতা যাচাইয়ের বিষয়গুলো সামনে এসেছে। তবে দলীয় প্রভাব ও অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট নেতারা তা অস্বীকার করেছেন।

জিএ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন