সামাজিক মাধ্যমে আসক্তি : মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নতুন প্রজন্ম

জান্নাতুল সাদিয়া 

প্রকাশ: ২১:৩১, ৮ জুন ২০২৬

সামাজিক মাধ্যমে আসক্তি : মানসিক স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে নতুন প্রজন্ম

ছবি: সংগৃহীত

সামাজিক মাধ্যম আমাদের নানাভাবে প্রভাবিত করে। সমষ্টিগতভাবে এর অনেক উপকারিতা কিংবা প্রয়োজনীয়তা থাকলেও ব্যক্তিগতভাবে তা আমাদের অনেক ক্ষতি করছে, যা অনেকটা স্লো পয়জনিং বা ধীর গতির বিষ প্রয়োগের মতো।  

সামাজিক মাধ্যম কীভাবে আমাদের মানসিক স্বাস্থ্যকে প্রভাবিত করছে বা এগুলো আদৌ আমাদের জন্য ভালো কিনা এসবের ওপর গত ১০ বছর ধরে পৃথিবীতে কয়েক শ গবেষণা হয়েছে এবং হচ্ছে। মানসিক স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে ব্যক্তিগত কিংবা সামাজিক কোনো ক্ষেত্রেই সেই ব্যক্তি সঠিক ভূমিকা রাখতে পারবে না। পদে পদে নিজেকে এবং অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। বিভিন্ন গবেষণায় এই তথ্য বেরিয়ে এসেছে।উন্নত বিশ্বে মনোবিজ্ঞানীদের গবেষণায় বারবার তিনটা মাধ্যমই সবচেয়ে বেশি প্রাধান্য পেয়েছে এবং পাচ্ছে, আর তা  হলো ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও স্ন্যাপচ্যাট।

গবেষকদের মতে, মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, ভিডিও গেমে বেশি সময় কাটানোর ফলে এখনকার তরুণ সমাজের মুখোমুখি আড্ডায় অনীহা তৈরি হয়েছে। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোতে একে অপরে তিরস্কার কিংবা অপমানের শিকার হওয়ার কারণেও তরুণদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবস্থা নিয়ে দ্য ওয়ার্ল্ড ফেডারেশন ফর মেন্টাল হেলথ তাদের একটি আর্টিকেলে প্রকাশ করেছে, তরুণদের মানসিক জগতকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করছে সাইবার বুলিংয়ের (কটূক্তি করা) ঘটনাগুলো। প্রযুক্তির অপব্যবহারের কারণে এই বুলিংয়ের ঘটনা বেড়েই চলেছে।নিদ্রাহীনতা, বিষণ্ণতা, উদ্বেগ ইত্যাদি সমস্যাও তরুণ-তরুণীদের মনে প্রভাব ফেলছে। তরুণরা এক ধরনের ‘হাইপাররিয়েলিটিতে (পরাবাস্তব)’ বাস করছে বলে মনে করছেন আমেরিকান সাইকোলজি অ্যাসোসিয়েশনের (এপিএ) গবেষকরাও। 

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতির যে তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, সেটা সত্যিই উদ্বেগজনক। যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল ইয়ুথ রিস্ক সার্ভের ২০২১ সালের প্রতিবেদনে এর একটা চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। উচ্চবিদ্যালয়ে পড়ুয়াদের মধ্যে পরিচালিত জরিপে দেখা যাচ্ছে, ৪২ শতাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে এক বছর ধরে ক্রমাগত খারাপ লাগার অনুভূতি ছিল। ২২ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করবে কি না, এ বিষয়ে গভীরভাবে ভেবেছে। জরিপ থেকে পাওয়া যাচ্ছে, দিনে তিন ঘণ্টার বেশি সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কাটানো কিশোর বয়সীদের মধ্যে বিষণ্নতা ও দুশ্চিন্তায় ভোগার ঝুঁকি দ্বিগুণ। এ ছাড়া ১৩-১৭ বছর বয়সীদের ৪৬ শতাংশ তাদের শরীরের গঠন নিয়ে বাজে ধারণা পেয়েছে এবং ৬৪ শতাংশ মাঝেমধ্যে অথবা প্রায়ই ঘৃণাভিত্তিক আধেয়ের মুখোমুখি হয়েছে। 

দ্য ল্যানসেট চাইল্ড অ্যান্ড অ্যাডলসেন্ট হেলথ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাটিতে যুক্তরাজ্যের ১৩ থেকে ১৬ বছর বয়সী প্রায় ১০ হাজার কিশোর-কিশোরীর সাক্ষাত্কার নেয়া হয়। গবেষকরা দেখেছেন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলো কিশোরীদের মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি করতে পারে, তাদের উত্ত্যক্ত করার ঝুঁকি বাড়িয়ে তোলে এবং তাদের ঘুম ও শারীরিক অনুশীলন হ্রাস করে। এর ফলে তাদের মধ্যে হীনম্মন্যতা, দুশ্চিন্তা, অশান্তি ও হতাশা তথা মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করছে। 

বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও তরুণদের মানসিক জগতে চলছে নানা উত্থান-পতন। তরুণদের মানসিক সমস্যা প্রকাশ পায় তাদের আচরণের মধ্য দিয়ে। যানবাহনে হঠাৎ করে উত্তেজিত হয়ে যাওয়া, বন্ধুদের সামান্য বিদ্রুপ বা কৌতুকও সহ্য করতে না পারা, রাস্তায় রিকশাচালকের সঙ্গে চেঁচামেচি, সুযোগ পেলে কাউকে আক্রমণ করে কটু কথা বলা ইত্যাদি ঘটনা তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।   

সামাজিক মাধ্যমে আসক্তির সবচেয়ে বড় প্রভাব পরছে মানসিক স্বাস্থ্যে।অনলাইনের জীবনকে বাস্তবের সাথে তুলনা করা এবং হতাশায় ভোগা। এতে আত্মবিশ্বাস কমে যায় এবং মানসিক চাপ বৃদ্ধি পায়। পাশাপাশি উদ্বেগ , বিষণ্নতা এবং একাকীত্বের অনুভূতিও ক্রমশ বাড়ছে।ঘুমের অভাবের কারণে ক্লান্তি, মাথাব্যথা, মনোযোগের ঘাটতি এবং পড়াশোনায় দুর্বলতা দেখা দিচ্ছে।  ব্যক্তিগত জীবনে, সমাজে এবং পরিবারে ও এ আসক্তির প্রভাব পরে। তরুনরা মানসিক স্বাস্থ্যের যেসকল ঝুঁকির মধ্যে পরে তার মধ্যে কয়েকটি ক্রমাগত তুলনা ও হীনমন্যতা, কিছু হারানোর ভয়,সাইবার বুলিং ও মানসিক নির্যাতন,ঘুমের ব্যাঘাত ও ক্লান্তি,ডোপামিন হ্যাক ও আসক্তি। রয়েছে।

মনোবিজ্ঞানীরা বলছেন, ইন্টারনেট আসক্তি মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়িয়ে দেয়, যা ধীরে ধীরে নির্ভরতা তৈরি করে। এর ফলে ব্যবহারকারীরা আরও বেশি সময় অনলাইনে কাটাতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। অনেক ক্ষেত্রে এটি গেমিং আসক্তি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নির্ভরতা কিংবা অনলাইন জুয়ার মতো ঝুঁকিপূর্ণ আচরণেও রূপ নিতে পারে। শুধু মানসিক নয়, শারীরিক সমস্যাও তৈরি হচ্ছে। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে ঘাড় ও পিঠে ব্যথা, চোখের সমস্যা, অনিদ্রা, মাথাব্যথা এবং শারীরিক দুর্বলতার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব সম্পর্কে প্রথম আলো এবং চাইল্ড মাইন্ড ইন্সটিটিউট  এর মতো আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বেশ কিছু কার্যকরী পরামর্শ দিয়েছেন। যেমন— স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণ,ডিজিটাল ডিটক্স, বাস্তব জীবনের সংযোগ বৃদ্ধি,নোটিফিকেশন বন্ধ রাখা। 

বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ইন্টারনেট ব্যবহার বন্ধ করা নয়, বরং সঠিকভাবে ব্যবহার শেখানোই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত খেলাধুলা, বই পড়া, সামাজিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ এবং পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোর অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।  তাদের মতে, ডিজিটাল যুগে ইন্টারনেট ছাড়া চলা সম্ভব নয়। তবে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যবহার যাতে আসক্তিতে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে শিক্ষার্থীদের সচেতন করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

লেখক,জান্নাতুল সাদিয়া 
গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ 
বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়,রংপুর

জিএ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন