জিয়াউর রহমান: অমর ও মৃত্যুঞ্জয়ী

মো. হাবিবুর রহমান ও মামদুদুর রহমান 

প্রকাশ: ১৯:৪৬, ৩০ মে ২০২৬

জিয়াউর রহমান: অমর ও মৃত্যুঞ্জয়ী

ছবি: সংগৃহীত

লেফটেন্যান্ট জেনারেল জিয়াউর রহমান (১৯৩৬-১৯৮১) বাংলাদেশের ইতিহাসে ও আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। যেখানে আছে নানা রোমাঞ্চকর ঘটনা এবং ইতিহাসের ঘটনাবহুল বর্ণনা। ইতিহাসে তিনি আপন মহিমায় সমুজ্জ্বল ছিলেন। সৈনিক জীবন, যুদ্ধে বীরত্বগাঁথা এবং অল্প সময়ের জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার যে সুযোগ পেয়েছেন, সেখানে তিনি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের জন্য বীর উত্তম খেতাবে অভিষিক্ত হয়েছেন।

বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল- বিএনপি’র প্রতিষ্ঠাতা, বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রচলন, অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পূনর্গঠন, আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে বিভিন্ন উন্নয়ন  মূলক কর্মসূচি প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন এবং বৈদেশিক ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির প্রচলন করার কারণে তাঁর দর্শনের প্রাসঙ্গিকতা আজও রয়ে গেছে। এছাড়াও বাংলাদেশে যেহেতু বিভিন্ন জাতি ও গোষ্ঠীর বসবাস রয়েছে, তাঁরা কি হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিবে, এ সকল বিষয় নিয়ে যখন বাঙালি ও অবাঙালিদের মধ্যে দ্বিধা ও উত্তেজনা বিরাজমান ছিল, তখন তিনি দীপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন ”বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদ”। সুতরাং তাঁর কর্ম (সৈনিক জীবন) জীবন এবং রাষ্ট্রীয় শাসন পর্যালোচনার মাধ্যমে তাঁর দর্শন সম্পর্কে ধারনা লাভ করা বর্তমানে প্রাসঙ্গিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বাংলা অঞ্চলে বিজয় ও পূর্ববঙ্গে বাঙালিদের বিজয় মরহুম প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান অল্প বয়সেই তথা চাকরি জীবন থেকে উদযাপন করতেন। যেমন: 'একটি জাতির জন্ম ' এতে জিয়াউর রহমান বলেন, ”১৯৫৪ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হল নির্বাচন। যুক্তফ্রন্টের বিজয় রথের চাকার নিচে পিষ্ট হল মুসলিম লীগ। বাঙালিদের আশা-আকাঙ্ক্ষার মূর্ত প্রতীক যুক্তফ্রন্টের বিজয় কেতন উড়ল বাংলায়। আমি তখন দ্বিতীয় পর্যায়ের ক্যাডেট।

আমাদের মনেও জাগল তখন পুলকের শিহরণ। যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনি সাফল্যের আনন্দে উদ্বেলিত হলাম আমরা সবাই। পর্বত ঘেরা অ্যাবোটাবাদের প্রত্যন্ত অঞ্চলে আমরা বাঙালি ক্যাডেটরা আনন্দে হলাম আত্মহারা। খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করলাম সেই বাঁধভাঙ্গা আনন্দের তরঙ্গমালা। একাডেমি ক্যাফেটরিয়াল নির্বাচনী বিজয় উৎসব করলাম আমরা। এ ছিল আমাদের বাংলা ভাষার জয়। এ ছিল আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষার জয়, এ ছিল আমাদের জনগণের, আমাদের দেশের একটি বিরাট সাফল্য।” সতুরাং এ সকল বিষয় থেকে তাঁর দেশপ্রেম ও পূর্ববঙ্গে আলাদা জাতিসত্ত্বার যে পরিচয় থাকা দরকার তা এখানে ফুটে উঠেছে।

শফিক রেহমান (২০২৫) তাঁর লিখিত "রাষ্ট্রনায়ক জিয়াউর রহমান" গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন- ‘জিয়া সত্যিই ছিলেন এক মৃত্যুঞ্জয়ী ব্যক্তি। তাঁর আদর্শ ও লক্ষ্য ছিল বাস্তবমুখী। তাই জনতার কাছে বিএনপি’র আবেদন এখন আরো বেশি।’ অন্যদিকে বাংলাদেশে যে কয়জন জনপ্রিয় ব্যক্তি সর্বজন মহলে জনপ্রিয় হয়ে আছেন- তাঁর মধ্যে জিয়াউর রহমান অন্যতম। এখনও তাঁর জনপ্রিয়তা এবং ব্যক্তিত্বের মোহ কাটেনি। গণভোট এবং রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য রাজনৈতিক কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য ‘গণতান্ত্রিক’ কর্মসূচির উন্মুক্তকরণ তাঁর অন্যতম উদ্যোগ।

শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর বিভিন্ন নীতি ও কর্মসূচির মধ্যে ১৯ দফা কর্মসূচি সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এর দফাগুলোতে তিনি দেশের আর্থ-সামাজিক মুক্তির লক্ষ্যে ঘোষণা করেছিলেন। ১৯ দফাসমূহ যথাক্রমে- দেশের স্বাধীনতা, অখন্ডতা ও সার্বভৌমত্ব; শাসনতন্ত্রের চারটি মূলনীতির মধ্যে মূলত-সর্বশক্তিমান আল্লাহর প্রতি সর্বাত্মক বিশ্বাস ও আস্থা, গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ন্যায়বিচারের অর্থে সমাজতন্ত্র জাতীয় জীবনে সর্বাত্মক প্রতিফলন; আত্মনির্ভরশীল জাতি; প্রশাসনের সর্বস্তরে শৃঙ্খলা, উন্নয়ন কার্যক্রমে ও আইন শৃঙ্খলা রক্ষার ব্যাপারে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা; কৃষিতে উন্নয়নের মাধ্যমে গ্রামীণ, বিশেষত জাতীয় অর্থনীতিকে জোরদারকরণ; খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা এবং ক্ষুধা মোকাবেলা; দেশে কাপড়ের উৎপাদন বৃদ্ধি এবং কাপড়ের চাহিদা পূরণ; গৃহহীনদের গৃহায়ন; নিরক্ষতা দূরীকরণ; চিকিৎসার সুব্যবস্থা; সমাজে নারীর যথাযোগ্য মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা ও যুবসমাজকে সুসংহত করে জাতি গঠনে উদ্বুদ্ধকরণ; অর্থনৈতিক উন্নয়নে বেসরকারি খাতকে প্রয়োজনীয় উৎসাহ প্রদান; শ্রমিকদের অবস্থার উন্নতি সাধন ও উৎপাদন বৃদ্ধির সার্থে সুস্থ শ্রমিক-মালিক সম্পর্ক গড়ে তোলা;

সরকারী চাকরিজীবীদেরকে জনসেবা ও দেশ গঠনের মনোবৃত্তি তৈরিতে উৎসাহ প্রদান ও তাঁদের আর্থিক অবস্থার উন্নয়ন; জনসংখ্যার বিস্ফোরণ রোধ; সকল বিদেশী রাষ্ট্রের সাথে সমতার ভিত্তিতে বন্ধুত্ব গড়ে তোলা ও মুসলিম দেশ গুলোর সাথে সম্পর্ক জোরদার করা; প্রশাসন ও উন্নয়ন ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণসহ স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ; দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়নীতি ভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থা কায়েমসহ ধর্ম, গোত্র ও বর্ণ নির্বিশেষে সকল নাগরিকের অধিকার পূর্ণ সংরক্ষণ করা এবং জাতীয় ঐক্য ও সংহতি সুদৃঢ় করা। উপর্যুক্ত দফাগুলোর মধ্যে কয়েকটি দফার প্রাসঙ্গিকতা না থাকলেও কিছু দফার প্রাসঙ্গিকতা আজও রয়েছে। যা বর্তমান বিএনপি সরকার এবং জনগণের সদিচ্ছার উপর ভবিষ্যত নির্ভর করছে। এক্ষেত্রে বর্তমান  সরকারকে জোরালো ভূমিকা নেওয়ার পাশাপাশি তা বাস্তবায়নের লক্ষ্যে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। যা আগামীর বাংলাদেশের সমৃদ্ধি ও উন্নতি নির্ভর করছে।

সিপাহী বিপ্লব জিয়াউর রহমানের জীবনে এক তাৎপর্যপূর্ণ দিক। তৎকালীন সময় ও অবস্থার কারণে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান রাজনীতিতে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেন। যা ড. আবদুল লতিফ মাসুম (১৯৯৯) তাঁর ‘জিয়াউর রহমান- আচ্ছাদিত ইতিহাস’ গ্রন্থে এ বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। এ গ্রন্থে তিনি উল্লেখ করেন-”একটি রাজনৈতিক দুর্যোগ থেকে মুক্তির জন্য জনগণ মনস্তাত্ত্বিকভাবে একটি শক্তিশালী সরকারের জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়বে এটাই “রাজনৈতিক ব্যাকরণের’ দাবি। আর মিলিটারি পলিটিক্স সম্পর্কে আধুনিক দুনিয়ার জনপ্রিয় লেখক এডওয়ার্ড ফিয়েট ঠিক, এই অবস্থাকে জনগণের জন্য ‘ওয়েলকাম রিলিফ’ বলে বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পট প্রক্রিয়ায় ৭৫ সালের ৭ নভেম্বরর সিপাহী বিপ্লব ছিল এমনি ধরনের একটি ওয়েলকাম রিলিফ। এই পরিবর্তন আকাঙক্ষা বা বিপ্লবের মাধ্যমে জনগণ অব্যাহত অনিশ্চয়তা, নৈরাজ্য এবং দেশীবিদেশী ষড়যন্ত্রকে সমূলে উৎপাটিত করে একজন শক্ত মানুষের হাতে শক্ত সরকার প্রতিষ্ঠার বৈধ কর্তৃত্ব অর্পণ করেছিল।

বাংলাদেশে ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বর অনুষ্ঠিত সিপাহী বিপ্লব ছিল সমসাময়িক পৃথিবীর ইতিহাসে একটি বিরল ঘটনা. .. জিয়াউর রহমানের ক্ষমতায় অধিষ্ঠানকে জনগণ ‍মিছিলের স্রোত আর উল্লাস দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে। .. . এই উপমহাদেশের সৈনিকরা সিপাহী বিপ্লব করেছিল ১৮৫৭ সালে ঔপনিবেশিক শক্তির বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য, আর ১৯৭৫ সালে তাঁরা আবার বিপ্লব করেছে তাদের ভাষায় স্বাধীনতা রক্ষার জন্য। সৈনিকরা ৭ নভেম্বরে- নির্দেশের পদসোপানকে অগ্রাহ্য করে, শৃংখলার ব্যারিকেড ভঙ্গ করে, জীবনকে বাজি রেখে বিপ্লবকে যেভাবে সফল করেছিল স্বাভাবিক সময়ে স্বাভাবিক নিয়মে তা কল্পনাও করা যায় না। একটি পেশাগত সেনাবাহিনীর জন্য এটি ছিল একটি ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনা। এটি রাজনীতি বিজ্ঞানের তথাকথিত প্রথাগত গতানুগতিক অভ্যুত্থান ।“ সতুরাং উপর্যুক্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে ৭৫ পরবর্তী ইতিহাস এবং রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের ঘটনা নতুনভাবে পর্যালোচনা করা খুবই প্রয়োজন।

জিয়াউর রহমানের শাসনামলে সংবিধান পরিবর্তন, অর্থনৈতিক কর্মসূচি, প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণ, চাকরির বাজার সৃষ্টি, শহরের বাসিন্দাদের জন্য নানামুখি ইতিবাচক কমূসূচি, শ্রমজীবীদের অধিকার, ইসলামী মূল্যবোধের প্রসার, জাতীয়করণ, মিশ্র অর্থনীতির প্রণয়ন, গণতন্ত্রের প্রসার, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, পররাষ্ট্রনীতিসহ বহুমুখী নীতির কারণে বাংলাদেশের সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনের অনেক পরিবর্তন এসেছে।

আজকের এই দিনে (৩০ মে) চট্টগ্রামে এক সেনা অভ্যুত্থানরে মাধ্যমে তাঁকে হত্যা করা হয়। যদিও তাঁর হত্যাকাণ্ড নিয়ে এখনও অনেক প্রশ্নের উত্তর এবং হত্যাকাণ্ডের রহস্য আজও উন্মোচিত হয়নি। যা নিয়ে আরো বিচার -বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। জিয়ার হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে বাংলাদেশের এক অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে। এ ক্ষতি পূরণের জন্য তাঁর দর্শন এবং বাংলাদেশ নিয়ে যে তাঁর যে পরিকল্পনা রয়েছে- তা বাস্তবায়ন করতে হবে। তাঁর নামাযে জানাযায় লক্ষ লক্ষ মানুষের অংশগ্রহণ এবং আজও মানুষের হৃদয়ে তাঁর জন্য ভালোবাসা প্রমাণ করে যে- জিয়াউর রহমান -অমর ও মৃত্যুঞ্জয়ী।

লেখক-
মো. হাবিবুর রহমান
কবি, লেখক ও গবেষক;
এবং
মামদুদুর রহমান
লেখক ও তথ্যবিজ্ঞানী

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন