আরাফাত আলম
প্রকাশ: ২১:০৩, ২ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
শিশির ভেজা নীলিমার সেই ধূসর চাদর যখন সরে গিয়ে ভোরের প্রথম আলো পৃথিবীর জানালায় উঁকি দেয়ার সুযোগ করে দেয়, তখনই ক্যালেন্ডারের পাতা স্মরণ করিয়ে দেয়—আজ ২ এপ্রিল, বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। একটি বিশেষ দিন, যে দিনটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় সেই শিশুদের কথা, যারা আমাদের এই চেনা পৃথিবীর ভিড়ে এক অজানা ‘কাঁচের পর্দা আচ্ছাদিত ঘরে’ বাস করে।
অটিজম অসুখ নয়, বরং এটি একটি ভিন্নভাবে তৈরি হওয়া হৃদয়ের স্পন্দন। খোদার সৃষ্টি এক বৈচিত্র্য। পৃথিবীর বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্যেরই অংশ। প্রতিটি অটিস্টিক শিশু যেন এক একটি নীল পদ্ম, যারা ফুটে থাকে নিজস্ব এক সরোবরে। আমরা যে সমাজকে ‘স্বাভাবিক’ বলি, তারা হয়তো সেই ব্যাকরণের সাথে ভিন্ন পথ খুঁজে। তাদের চোখের কোণে এক গভীর বিষাদ মেশানো কৌতূহল থাকে, যা হয়তো আমাদের প্রচলিত শব্দের ভাষায় ধরা দেয় না, হয়তো মানুষের চোখে চোখ রেখে কথা বলা এড়াতেই পছন্দ করে, কিংবা একই কাজের চেনা বৃত্তে বারবার ঘুরপাক খায়—কিন্তু এই ভিন্নতার নাম তো অভিশাপ নয়, এই ভিন্নতার নাম এক অলৌকিক বৈচিত্র্য।
জাতীয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তি জরিপ (NSPD) ২০২১-এর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২.৮০% কোনো না কোনোভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। এর মধ্যে একটি বড় অংশ অটিজম স্পেকট্রাম ডিজঅর্ডারে (ASD) আক্রান্ত। গবেষণাপত্র ও সরকারি তথ্যমতে, বাংলাদেশে অটিজমের গড় হার প্রায় ০.১৫%, যা সংখ্যায় প্রায় ২.৫০ লক্ষ থেকে ৩ লক্ষ (তবে বেসরকারি মতে এটি আরও বেশি হতে পারে)। ঢাকা শহরের মতো নগর এলাকায় অটিজমের হার বেশি দেখা যায় (প্রায় ৩%), যেখানে গ্রামীণ এলাকায় এটি তুলনামূলক কম (প্রায় ০.১৪%)। শহরাঞ্চলে সচেতনতা ও শনাক্তকরণ ব্যবস্থা উন্নত হওয়ায় হয়তোবা এই পরিসংখ্যানগত পার্থক্য দেখা যায়।ৎঅটিজমে আক্রান্তদের মধ্যে ছেলেদের অনুপাত মেয়েদের চেয়ে অনেক বেশি। গবেষণায় দেখা গেছে, প্রতি ১০০০ জন শিশুর মধ্যে প্রায় ১৭ জন অটিজম নিয়ে জন্মাচ্ছে, যেখানে ছেলেদের ঝুঁকি মেয়েদের তুলনায় প্রায় ৪ গুণ বেশি।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এই দিনটি এক বড় আশার প্রদীপ। একইদিন হোক অঙ্গিকারবদ্ধ হওয়ার।
যেখানে একসময় এই শিশুদের অবহেলা আর অন্ধকারের আড়ালে লুকিয়ে রাখা হতো, হীনমন্যতা, সংকীর্ণতা মনে হতো। এইদিন হোক সকল ভূল ধারনা দূর করার। তাদের নিয়ে স্বপ্নের বীজ বুনার।
তবে কেবল একদিন নীল আলোয় দালান সাজানোই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন আমাদের মনের অন্ধকার দূর করা। তাদের প্রতি কৃপা বা দয়া নয়, বরং ভালোবাসার এক উষ্ণ আলিঙ্গন প্রয়োজন।
তাদের সামগ্রিক আচরণ স্বাভাবিক না হলেও কিছু বিশেষ ক্ষেত্রে অত্যাধিক অভিজ্ঞ হয়। ব্যক্তি ভেদে ভিন্ন ভিন্ন কাজে। যা তাকে বিশেষ কাজে সেরা করে তুলতে পারে। তাদের সেক্টরটাকে খুঁজে বের করা এবং ভূমিকা রাখার সুযোগ করে দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ।
কিছু প্রস্তাবনা এমন হতে পারে,
১. কর্মসংস্থানে বিশেষায়িত সুযোগ সৃষ্টি:
অটিস্টিক ব্যক্তিরা অনেক সময় সাধারণ মানুষের চেয়েও নির্দিষ্ট কিছু কাজে বেশি দক্ষ হন। যেমন,
ক. আইটি ও ডাটা এন্ট্রি: অনেক অটিস্টিক ব্যক্তির প্যাটার্ন চেনার অসাধারণ ক্ষমতা থাকে। সফটওয়্যার টেস্টিং, কোডিং এবং ডাটা এনালিস্ট হিসেবে তারা চমৎকার কাজ করতে পারেন। (যেমন: বিশ্বখ্যাত প্রতিষ্ঠান SAP এবং Microsoft অটিস্টিক কর্মীদের জন্য বিশেষ নিয়োগ প্রোগ্রাম চালায়)।
খ. গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ: খুঁটিনাটি বিষয়ে গভীর মনোযোগ দেওয়ার ক্ষমতার কারণে তারা ম্যানুফ্যাকচারিং বা খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্পে কোয়ালিটি কন্ট্রোলার হিসেবে সফল হতে পারেন।
২. ভোকেশনাল ও কারিগরি প্রশিক্ষণ:
তাদের আগ্রহের জায়গা অনুযায়ী বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে:
ক. গ্রাফিক্স ও ক্রাফট: চিত্রাঙ্কন, গ্রাফিক্স ডিজাইন বা হস্তশিল্পে তাদের সৃজনশীলতাকে কাজে লাগিয়ে ক্ষুদ্র ও মাঝারি কুটির শিল্প গড়ে তোলা সম্ভব।
খ. অফিস ব্যবস্থাপনা: ফাইল গুছিয়ে রাখা বা সুশৃঙ্খলভাবে কোনো কাজ সম্পন্ন করায় তাদের দক্ষতা কাজে লাগানো যায়।
৩. অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা ও সহায়ক পরিবেশ:
নিউরো-ডাইভার্সিটি ফ্রেন্ডলি অফিস: কর্মক্ষেত্রে অতিরিক্ত শব্দ বা তীব্র আলো কমিয়ে তাদের জন্য আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি করা।
ক. মেন্টরশিপ: কর্মক্ষেত্রে একজন মেন্টর নিয়োগ করা, যিনি তাদের সামাজিক যোগাযোগ ও কাজের নির্দেশনা বুঝতে সাহায্য করবেন।
৪. আইনি ও নীতিগত কাঠামো:
ক. কোটা ব্যবস্থা: সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে অটিস্টিক ব্যক্তিদের জন্য নির্দিষ্ট কোটা বা বিশেষ সুযোগ নিশ্চিত করা।
খ. কর ছাড়: যেসকল প্রতিষ্ঠান অটিস্টিক ব্যক্তিদের নিয়োগ দেবে, তাদের বিশেষ কর ছাড় প্রদান করা।
গ. বীমা সুবিধা: তাদের স্বাস্থ্য ও জীবন বীমার আওতায় আনা যাতে পরিবারগুলো তাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে।
৫. সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন: আমাদের বুঝতে হবে যে, তারা "অক্ষম" নয় বরং "ভিন্নভাবে সক্ষম"। তাদের সীমাবদ্ধতার চেয়ে সক্ষমতার দিকে বেশি নজর দিতে হবে।
আসুন, আজ এই ২ এপ্রিলে আমরা শপথ নেই—আমরা তাদের কাঁচের দেয়াল ভাঙব না, বরং সেই দেয়ালের ভেতরে প্রবেশ করে তাদের জগতটাকে আপন করে নেব। কারণ, প্রতিটি নীল রঙের আড়ালে লুকিয়ে থাকে এক একটি অসম্ভব সুন্দর সম্ভাবনা, যা কেবল ভালোবাসার স্পর্শেই প্রস্ফুটিত হতে পারে।
আরাফাত আলম,
মুখপাত্র, কানেক্টিং ডটস
জিএ