মোঃ তানভীর হাসান
প্রকাশ: ২০:৫১, ২ এপ্রিল ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
প্রতি বছর ২ এপ্রিল বিশ্বজুড়ে পালিত হয় বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবস। ২০২৬ সালের জন্য জাতিসংঘ এই দিবসের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে “অটিজম ও মানবতা, প্রতিটি জীবনেরই মূল্য আছে” (Autism and Humanity – Every Life Has Value)। এই প্রতিপাদ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিরাও আমাদের সমাজেরই অংশ, তাদেরও সমান অধিকার ও অবদান রাখার সক্ষমতা রয়েছে। এখন শুধু সচেতনতার মাধ্যমে নয়, বরং তাদের পূর্ণাঙ্গ অস্তিত্ব, সম্মান ও ক্ষমতায়নের দিকে দৃঢ় পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এসেছে।
অটিজম বা অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডার কোনো রোগ নয়; এটি একটি স্নায়বিক বিকাশগত অবস্থা বা নিউরোডাইভারসিটি, যা সাধারণত শিশুর জন্মের প্রথম কয়েক বছরের মধ্যেই প্রকাশ পায়। এর ফলে মূলত যোগাযোগ স্থাপন, সামাজিক মিথস্ক্রিয়া এবং আচরণগত ক্ষেত্রে বিভিন্নতা দেখা যায়।
অটিজমের সাধারণ লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে ভাষাগত জটিলতা যেমন নির্দিষ্ট বয়সে কথা বলতে দেরি হওয়া বা ভাষা বুঝতে সমস্যা, সামাজিক মিথস্ক্রিয়ায় নাম ধরে ডাকলে সাড়া না দেওয়া, চোখের দিকে তাকিয়ে কথা না বলা বা সমবয়সীদের সাথে মিশতে না পারা। এছাড়াও আচরণগত দিক থেকে একই কাজ বারবার করা, নির্দিষ্ট বিষয়ে তীব্র আগ্রহ এবং সংবেদনশীলতায় (সেন্সরি প্রসেসিং) বিভিন্নতা দেখা যায়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতি ১০০ জন শিশুর মধ্যে ১ জন অটিজম স্পেকট্রাম ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত। এছাড়াও মেয়েদের তুলনায় ছেলেদের মধ্যে অটিজমে আক্রান্ত হওয়ার হার প্রায় ৪ গুণ বেশি।
বাংলাদেশের পরিস্থিতিও কম উদ্বেগজনক নয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) ইনস্টিটিউট অব পেডিয়াট্রিক নিউরোডিসঅর্ডার অ্যান্ড অটিজম (আইপিএনএ) এর পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি ১০ হাজার শিশুর মধ্যে প্রায় ১৭ জন অটিজমে আক্রান্ত। সরকারের সমাজসেবা অধিদপ্তরের ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন’ সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুসারে, দেশে নিবন্ধিত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অংশ অটিজম এবং অন্যান্য নিউরোডেভেলপমেন্টাল ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত।
যোগাযোগের বাধা দূরীকরণে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসকের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ চিকিৎসক প্রতিনিয়ত দেখতে পান, কীভাবে সঠিক এবং কার্যকরী যোগাযোগ সেবা একজন অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তির জীবনে আমূল পরিবর্তন আনতে পারে। অটিজমে আক্রান্ত অনেক ব্যক্তির জন্যই নিজের প্রয়োজন বা মনের ভাব প্রকাশ করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসক শুধুমাত্র তাদের কথা বলার দক্ষতা বাড়ান না, বরং বিকল্প যোগাযোগ পদ্ধতি তৈরি করে তাদের সামাজিক অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করেন।
অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের জীবনমান উন্নয়ন এবং তাদের অধিকার সুরক্ষায় আমাদের ভূমিকা অত্যধিক গুরুত্বপূর্ণ। একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠনে বাংলাদেশে ইতোমধ্যে অনেক প্রশংসনীয় পদক্ষেপ রয়েছে, তবে বর্তমান প্রেক্ষাপট এবং ভবিষ্যতে যা করা প্রয়োজন তার মধ্যে রয়েছে সেবার বিকেন্দ্রীকরণ ও সহজলভ্যতা নিশ্চিত করা। বর্তমানে উন্নত সেবা কেবল ঢাকা ও কিছু বিভাগীয় শহরে সীমাবদ্ধ। এ অবস্থায় প্রতিটি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে স্পিচ অ্যান্ড ল্যাংগুয়েজ থেরাপি চিকিৎসা সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়াও অটিজম শনাক্তকরণ থেকে শুরু করে চিকিৎসা ও সুরক্ষা সেবা, যাতে সব একই কেন্দ্র থেকে পাওয়া যায়, এমন ‘ওয়ান-স্টপ সার্ভিস সেন্টার’ জেলা পর্যায়ে প্রতিষ্ঠা করা প্রয়োজন।
শিক্ষাক্ষেত্রে বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। সাধারণ স্কুলগুলোতে অটিজম বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিশুদের জন্য ‘ইনক্লুসিভ ক্লাস’ এবং বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত শিক্ষক নিয়োগ করা, যাতে তারা মূলধারার শিক্ষায় যুক্ত হতে পারেন। কর্মসংস্থান ও আইনগত সুরক্ষার ক্ষেত্রে সরকারি ও বেসরকারি চাকরিতে অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের জন্য বিশেষ কোটা নিশ্চিত করা জরুরি। একইসঙ্গে ‘প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন, ২০১৩’ এবং ‘নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট আইন, ২০১৩’ এর শতভাগ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সচেতনতা ও গবেষণার ক্ষেত্রে অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের একটি সঠিক ও আধুনিক ডিজিটাল ডাটাবেজ তৈরি করা প্রয়োজন, যাতে সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টন সহজ হয়। এছাড়াও ক্লিনিক্যাল এডুকেশন ও নিউরো-রিহ্যাবিলিটেশন সেক্টরে সরকারি গবেষণা অনুদান বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে দেশীয় প্রেক্ষাপটে কার্যকর থেরাপি মডেল তৈরি করা যায়।
পরিবার ও থেরাপিস্টদের সহায়তার ক্ষেত্রে অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তি ও তাদের যত্নদানকারীদের মাসিক ভাতার পরিমাণ বৃদ্ধি করা এবং তাদের জন্য স্বতন্ত্র স্বাস্থ্য বিমার ব্যবস্থা করা জরুরি। এছাড়াও রিহ্যাবিলিটেশন চিকিৎসার সাথে যুক্ত পেশাজীবীদের (যেমন স্পিচ থেরাপিস্ট) সরকারি কাঠামোতে পদ সৃষ্টি ও যথাযথ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
সরকারের একার পক্ষে এটা সম্ভব নয়; তবে সরকারের সদিচ্ছা, সঠিক নীতিমালা এবং অবকাঠামোগত সহায়তাই পারে অটিজম আক্রান্ত ব্যক্তিদের মূলধারার নাগরিক হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে। ২০২৬ সালের বিশ্ব অটিজম সচেতনতা দিবসে আমাদের অঙ্গীকার হওয়া উচিত যে একটি বৈষম্যহীন এবং অটিজমবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলা।
লেখক: মোঃ তানভীর হাসান
লেকচারার, ময়মনসিংহ কলেজ অব ফিজিওথেরাপি এন্ড হেলথ সায়েন্স