শৈশবের ঈদ: অপেক্ষা, আনন্দ আর না ফুরানো গল্প

মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলাম, হাটহাজারী (চট্টগ্রাম)

প্রকাশ: ১৫:১৯, ২২ মার্চ ২০২৬

শৈশবের ঈদ: অপেক্ষা, আনন্দ আর না ফুরানো গল্প

ছবি: সংগৃহীত

ছোটকালে ঈদ ছিলো মহানন্দের দিন।এক বছর অপেক্ষায় থাকতাম কখন ঈদ আসবে। রোজা আসার সাথে সাথে ঈদের চিন্তা শুরু হতো। একদিন একদিন করে গণনা শুরু করতাম বাড়ির অন্যসব খেলার সাথীদের নিয়ে।

ঈদের আমেজ পূর্ণতা পেতো ঈদ শপিং করে যেটাকে ‘ইদ্দে মার্কেট’ নামেই বলে আলাদা তৃপ্তি অনুভব করি। 
ঈদের কাপর বাড়ির কেও একজন কিনলেই বাসায় কান্নাকাটি শুরু কখন আমাদের মার্কেট করা হবে।  কখন নিয়ে যাবে আমাদের।

সময়ও চলে আসতো দিনটার। বড় ভাই শহরে নিউ মার্কেট অথবা স্থানীয় মার্কেটে নিয়ে যেতো।শার্ট,পেন্ট,জুতা,ভেল্ট এসব কিনে অপেক্ষা করতাম কখন বাড়ি ফিরবো।

বাড়ি ফেরার পথ তখন অনেক লম্বা মনে হতো।বাড়ি আসতাম, আম্মু, বোন বাসার সবাইকে কাপর পড়ে দেখাতাম। সেই কি আনন্দ! নতুন কাপর পড়ে সবাইকে দেখানোর আনন্দ কোনো কলমের লেখনীতে প্রকাশ করা হয়তো সম্ভব হবে না।

বাসার সবাই দেখার পর বাড়ির সমবয়সী খেলার সাথীরা আসতো কাপর দেখতে। তাদের দেখাতাম, তারাও দেখে কখনো অসুন্দর বলতো না কখনো।

এবার ঈদের জন্য অপেক্ষা করার কষ্ট আরো তীব্রতর হতো। প্রতি দিন ২-৩ বার নতুন কাপর দেখতাম। বাসায় আম্মু বলতো কাপর বেশি দেখলে আর বেশি দেখালে পুরোনো হয়ে যাবে।তায় পরে কেও দেখতে আসলে তাকে আর দেখাতাম না।তবে তারাও নাচর বান্দা কাপর দেখেই যেতো।

ঈদের জন্য অপেক্ষাটা দারুণ সুন্দর ছিলো। রোজা ২৯ টা যখন হতো বাড়ির সব ছেলে চাঁদ দেখতে জড়ো হতাম। চাঁদ উঠুক কিংবা না উঠুক চাঁদ দেখা গেছে স্লোগান সবার মুখে থাকতো।

চাঁদ উঠবে না সেটা কেও বললেও বিশ্বাস হতো না।অনেক খুঁজতাম,মনে হতো কেও না দেখলেও হয়তো আমি দেখবো। চাঁদের জন্য দেখতে দেখতে আকাশ অন্ধকার হয়ে আসতো, তারাবির সময়ও প্রায় হয়ে যেতো। তখন সবাই হাল ছেড়ে চলে আসতাম ঠিকই আশা কিন্তু থেকে যেতো। 

বাসায় এসে টিভিতে দেখতাম কোথাও চাঁদ দেখা গেলো কিনা। কিন্তু না সেখানেও দেখা যায় না।তখন শেষ তারাবি পরতে চলে যেতাম। আর যাওয়ার সময় দেখতাম চাঁদ দেখা যাচ্ছে না কিনা।

পরে অবশ্য মেনে নিতাম আজ আর চাঁদ দেখা যাবে না। এভাবেই ঈদের আপেক্ষা আরো দীর্ঘ হতো। তখন সেই একদিনটা বহুদিন বহুকালের মতো মনে হতো।

দিন শেষ হতো, বাসায় চালের ঐতিহ্যেবাহী (গুরা পিঠা) বানানো হতো। 

চাঁদ রাত সেটা পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর রাত ছিলো। ইফতার শেষ করার আগেই রাস্তায় সবাই জড়ো হতাম।যেই যার মতো করে গলা ফাটিয়ে বলতো চাঁদ উঠছে।তখন কেও বাজি ফুটাতো না। তেমন দেখা যেতো না।

চাঁদ দেখার পর সবাই একজনকে অন্যজন ঈদ মোবারক বলে জড়িয়ে ধরতাম। "ও মোর রমজানেরই রোজার শেষে" গান গাইতাম। বাসায় এসেই টিভি দেখতাম। সেখানে বিটিভি তে শিশুদের ঈদের অনুষ্ঠান দেওয়া শুরু হতো। কতোই আনন্দের সাথে উপভোগ করতাম সেই অনুষ্ঠান।

সেই চাঁদ রাতে ঘুম আসতো না। ঘুম আসলেই পরদিন ঈদ বলে মনকে শান্ত করতাম কিন্তু ঘুমটা সহজেই আসতো না। একসময় ঘুমাতাম।

পরদিন সকালে উঠেই গোসল করে নতুন জামা কাপর সব পড়ে বাড়ির অন্য সমবয়সীদের ডাকতে চলে যেতাম। সবাই একসাথে মসজিদে গিয়ে ঈদের নামাজ শেষ করে কবরস্থান থেকে দ্রুত বাড়ি চলে আসতাম।

শুরু হতো বকশিস সংগ্রহের মিশন। কাদের বাসায় কতো টাকা দিবে সেসব আগে থেকেই ধারণা ছিলো। বাড়ির সমবয়সীদের মধ্যে থেকে নিজেদের একটা গ্রুপ হতো।  সেই গ্রুপের সদস্যদের নিয়ে চলে যেতাম এক এক জনের বাসায়।

বাসায় গিয়ে সবাইকে সালাম দিয়েই বলতাম বকশিস চাই। যাদের বলতে লজ্জা লাগতো তাদের বাসায় সেমাই,নুডলস খাওয়ার পরও চলে যাচ্ছি, চলে যাচ্ছি এটা দুইএকবার বলা হতো।

তারাও বকশিস রাখতো আমাদের জন্য। বাড়ির পর আসে পাশের যেসব ঘরে যাতায়াত ছিলো তাদের মধ্যে শুধু যারা এর আগের বছরগুলোতে বকশিস দিতো তাদের বাসায় যাওয়া হতো।
বাড়িতে বেড়ানোর পর আব্বুর সাথে আত্মীয়দের বাসায় যেতাম আর গুনতাম কতো টাকা বকশিস পেলাম।

এ সময়েয় ঈদের আনন্দ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতো ভাসমান দোকান।ঈদ উপলক্ষে এলাকার কেও কেও ছোট খেলনা,চিপ্স,লটার, আচার সহ বিভিন্ন দোকান দিয়ে বসতো। এসব দোকান থেকে বিভিন্ন জিনিস কিনা সেখানে ভিড় করে থাকার মধ্যে ছিলো অন্য রকম আনন্দ। 

তাদের থেকে লাদেন বোম,টিনের চকলেট গুলি,ইউ ইউ এসব খেলনা খুবই আকর্ষণীয় ছিলো।

এভাবেই মহা খুশির ঈদ ধীরে ধীরে শেষ হয়ে যেতো।সাতদিন পর আবার পড়ার টেবিলে বসতে হতো। কিছুদিন পর স্কুল, মাদ্রাসা খুলে ফেলতো। স্কুলে প্রথমদিন ঈদের জামা পড়ে যাওয়াটা সবার জন্য ফরজের মতো ছিলো। বন্ধুদের কে কতো টাকা বকশিস পেলাম সেটার গল্প, ঈদের আরো কতো গল্প বলতে বলতে মহাখুশির ঈদ শেষ হতো।

আবার শুরু হতো সামনের বছরের ঈদের ক্ষণ গণনা! 

 জিএ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন