সুবর্ণা আক্তার
প্রকাশ: ২১:৩০, ২০ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশে অবকাঠামো দুর্বলতা কাটানোর জন্য প্রচুর নির্মাণযজ্ঞ চলছে। তবে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পরিবেশের ওপর। বর্তমানে উন্নত বিশ্বে প্রকৃতির সঙ্গে সমন্বয় করে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার মডেল অনুসরণ করা হচ্ছে। এসব মডেলে প্রকৃতিকে সর্বোচ্চ গুরুত্বের জায়গায় রাখা হচ্ছে। আধুনিক অর্থনীতিবিদরা প্রকৃতির সঙ্গে অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র আবিষ্কার করেছেন। তারা দেখিয়েছেন, প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে অর্থনীতি ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অর্থনীতির এ নবধারণা সবুজ অর্থনীতি নামে পরিচিত।
সবুজ অর্থনীতি এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে পরিবেশের ক্ষতি না করে উন্নয়ন নিশ্চিত করা হয়। সহজভাবে বলতে গেলে এটি এমন এক ব্যবস্থা যেখানে শিল্প, কৃষি, অবকাঠামো এবং প্রযুক্তির প্রতিটি ধাপে প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখা হয়। জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচি (UNEP) সবুজ অর্থনীতিকে সংজ্ঞায়িত করেছে এমন একটি ব্যবস্থারূপে যা কার্বন নির্গমন কমায়, সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করে এবং সমাজের সকল স্তরের মানুষের জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করে। এটি শুধু পরিবেশ রক্ষার জন্য নয় বরং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও মানুষের জীবনমান উন্নত করার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
বর্তমান বিশ্ব যখন জলবায়ু পরিবর্তনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি, তখন উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করাই বড় চ্যালেঞ্জ। একদিকে শিল্পায়ন ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির প্রয়োজন আবার অন্যদিকে পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা করাও জরুরি। এই দ্বন্দ্বের সমাধানই হলো সবুজ অর্থনীতি। যা এমন একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা যেখানে পরিবেশের কোন ক্ষতি না করে উন্নয়ন করা সম্ভবপর হয়।
২০১১ সালের ইউএনইপি সবুজ অর্থনীতি প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, একটি অর্থনীতি সত্যিকার অর্থেই সবুজ হতে হলে শুধু দক্ষ হলেই চলবে না বরং তা ন্যায়সঙ্গতও হতে হবে। অর্থাৎ উন্নয়ন এমন হতে হবে যা শুধু পরিবেশবান্ধব নয় বরং সমাজের সব শ্রেণির মানুষের জন্যও ন্যায্য সুযোগ সৃষ্টি করে।
বিশ্বব্যাপী উন্নত দেশগুলো যখন জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সবুজ প্রযুক্তির দিকে ঝুঁকছে, তখন বাংলাদেশও ধীরে ধীরে সেই পথ অনুসরণ করছে। তবে এই অগ্রযাত্রাকে বেগবান করতে সরকারি নীতি সহায়তা, বেসরকারি বিনিয়োগের প্রসার এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা জরুরি। এখন সময় এসেছে পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীল থেকে টেকসই উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাওয়ার। সবুজ অর্থনীতি বাস্তবায়নে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ ও উন্নত পৃথিবী নিশ্চিত করা যায়।
বর্তমানে বিশ্বব্যাপী জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ু ও পানি দূষণ এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অতিরিক্ত ব্যবহার আমাদের টেকসই ভবিষ্যতের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রতি বছর বিশ্বে ৫২ গিগাটন কার্বন-ডাই-অক্সাইড ইকুইভ্যালেন্ট গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গত হচ্ছে, যা বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ। অপরিকল্পিত নগরায়ন, শিল্প-কারখানার দূষণ এবং বন উজাড়ের কারণে পরিবেশ তার ভারসাম্য হারাচ্ছে। এই অবস্থায় সবুজ অর্থনীতির গুরুত্ব আরও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সবুজ অর্থনীতি শুধু পরিবেশ সংরক্ষণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয় এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রেও কার্যকর। নবায়ন যোগ্য শক্তির ব্যবহার বৃদ্ধি, পরিবেশবান্ধব শিল্প ও কৃষির প্রসার এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নতি একদিকে যেমন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করে, তেমনি অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতিকে আরও স্থিতিশীল ও টেকসই করে। তাছাড়া সবুজ অর্থনীতির মাধ্যমে পানি, মাটি ও বায়ু দূষণ কমানো সম্ভব। যা মানুষের স্বাস্থ্য ও বাসযোগ্য পরিবেশ নিশ্চিত করতে সহায়ক।
বাংলাদেশ একটি জলবায়ু ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। যেখানে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং অন্যান্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ আমাদের জন্য বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। এসব পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার জন্য পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ করা এখন আর ভবিষ্যতের চিন্তা নয় বরং একটি জরুরি বাস্তবতা। এটি শুধুমাত্র পরিবেশ সংরক্ষণে সহায়তা করবে না বরং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৩ সালে ধারণা করা হয়েছিল যে, ২০৩০ সালের মধ্যে সৌর ও বায়ু শক্তি থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩০% ছাড়িয়ে যাবে। বাংলাদেশ সরকারও এই লক্ষ্যকে সামনে রেখে ২০৩০ সালের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে নবায়নযোগ্য শক্তির অংশ ৩০% করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এছাড়া ২০৪১ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ৪০% পরিচ্ছন্ন জ্বালানি থেকে সরবরাহ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে টেকসই ও পরিবেশবান্ধব বিদ্যুৎ ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাবে বলে আশা করা যায়।
তবে পরিবেশকে বিরূপ না করে উন্নয়ন কার্যক্রম চালাতে সবুজ অর্থনীতির ধারণার সঙ্গে এরই মধ্যে জড়িত হয়েছে বাংলাদেশ। সবুজ বিনিয়োগ এবং সবুজ ব্যাংকিংয়ের ধারণা সরকারিভাবে জনপ্রিয় করার প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। যেসব শিল্প-কারখানা যথাযথ পয়োনিষ্কাশনের ব্যবস্থা করছে, তাদেরকে কর রেয়াতের সুবিধা দেয়া হচ্ছে। ব্যাংকগুলো যেন পরিবেশ দূষণকারী কোনো কর্মকাণ্ডে বিনিয়োগ না করে, সে বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা আছে। তবে সবুজ অর্থনীতিকেন্দ্রিক এসব নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে না। ফলে তার কোনো সুফল মিলছে না। বাংলাদেশকে বাসযোগ্য রাখতে সবুজ অর্থনীতির বিকল্প নেই। সুতরাং সবুজ অর্থনীতি নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি স্তর থেকে শুরু করে একেবারে ব্যক্তি পর্যায়ে সমন্বিত প্রচেষ্টা চালাতে হবে।
সুবর্ণা আক্তার
শিক্ষার্থী, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর
জিএ