মো. নিশান খান, জাবি
প্রকাশ: ০০:১১, ১৭ ডিসেম্বর ২০২৫
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ সংগ্রাম ও আত্মত্যাগের পর আমরা পেয়েছি স্বাধীনতা, লাল সবুজে খচিত পতাকা এবং আত্মমর্যাদার এক অনন্য পরিচয়। আমাদের বিজয় দিবস, যা আমাদের জাতীয় গৌরব ও অহংকারের প্রতীক, শিখিয়েছে কীভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে হয়। তবে, এটি দুঃখজনক যে, বিজয় দিবসের প্রতি আমাদের আগ্রহ শুধু ডিসেম্বর মাসেই সীমাবদ্ধ থাকে। বিভিন্ন উৎসব ও অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বিজয় দিবস উদযাপিত হলেও, আমাদের অর্জনকে সারা বছর ধরে শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে উদযাপন করা উচিত। এতে তরুণ প্রজন্ম স্বাধীনতার ইতিহাস ও ঐতিহ্য সম্পর্কে আরও গভীরভাবে জানতে পারবে এবং আমাদের গৌরবময় ঐতিহ্যকে রাঙিয়ে রাখতে উৎসাহিত হবে। বিজয়ের ৫৪ বছরে পদার্পণ উপলক্ষ্যে জাহানঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়া কয়েকজন মেধাবী শিক্ষার্থীরা নিজেদের ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে দ্যা নেক্সট নিউজে।
'দেখ চেয়ে দেখ সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি'- পাঞ্জেরি, ফররুখ আহমদ।
বিজয় যেন শীতের কুয়াশার চাদরে আচ্ছাদিত সূর্য কিরণ, প্রভাতের সেই আলো। এটি আঁধারে নিমজ্জিত সকল জীবের আকাঙ্ক্ষিত মুক্তি। কিন্তু এটি ধরা দিয়েও যেন অধরা রয়ে যায়। তবে, বিজয় কি শুধু অত্যাচারীর অত্যাচার থেকে অত্যাচারিতের মুক্তি, না এটি মুক্তি ও স্বস্তির এক অপূর্ব পরিক্রমা। বাঙালি জাতিসত্তার এই সুদীর্ঘ মুক্তির যাত্রায় এক অনন্য সংযোজন আজকের এই বিজয় দিবস। এটি জাতীয় ঐক্যকে প্রতিষ্ঠিত করার ও জনজীবনে স্বস্তি ও উন্নয়ন নিশ্চিত করার এক অমোঘ প্রয়াস। বস্তুত, বিজয় একটি আপেক্ষিক ধারণা। এটি কোনো স্বৈরতন্ত্র বা রাষ্ট্রীয় অনাচার থেকে মুক্তির নাম নয় এটি একটি চলমান প্রক্রিয়া, যার মাধ্যমে স্বস্তি এবং সমৃদ্ধি এবং মুক্তি সবই জনমনে আসবে। বাঙালি জাতিসত্তার ইতিহাসে এর যাত্রা বহু পুরনো।
সেই তিতুমীরের বাঁশের কেল্লা থেকে শুরু। এরপর একে একে ঘটে গেল সিপাহী বিদ্রোহ, স্বরাজ আন্দোলন, অসহযোগ আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ছয় দফা আন্দোলন ,৬৯ এর গণ-অভ্যুত্থান এবং সর্বশেষ ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধ যা বাঙালি জাতিকে এনে দেয় কাঙ্ক্ষিত বিজয়। বিজিত ভূমিতে আবারও পরাধীনতার শৃঙ্খল পায়ে জড়াতে শুরু করে।এই পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙতে স্বাধীন বাংলাদেশ আবারও বাংলাদেশিদেরকে নামতে হয় আন্দোলনে। ফ্যাসিজমকে রুখতে আবারও প্রাণ দিতে হয় আসাদ এবং আবু সাঈদের মত বীর সন্তানদেরকে। ১৯৯০ এর গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার আন্দোলন ও সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া জুলাই বিপ্লব বাংলাদেশের ইতিহাসের কালো অধ্যায়েরই এক প্রচ্ছদ।
এখনও বিজয় বহুদূর, আজও বিজয়কে ভূলুণ্ঠিত করতে সদা তৎপর অপশক্তিগুলো। এজন্য,আমাদের বিজয়ী বীরদের সদা ঐক্যবদ্ধ থেকে বিজয়কে সুনিশ্চিত করতে হবে। আমাদের জ্ঞান বিজ্ঞানে নৈতিকতায় আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে উঠতে হবে। হতে হবে সমাজ,সংস্কৃতি ও রাজনীতি সচেতন এবং দুর্নীতি-অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার। এভাবেই একতার আলিঙ্গনে হারিয়ে যাওয়া বিজয় আমাদের কাছে টেনে নেবে পরম মমতায় । বিজয় হোক ঐক্যের, সাম্যের এবং কল্যাণের।
মো. আতিকুর রহমান, ইংরেজি বিভাগ, জাবি
১৬ই ডিসেম্বর: সার্বভৌমত্বের দলিল ও ঐক্যের প্রেরণা
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর—এই মহান দিনে আমরা পেয়েছিলাম সার্বভৌমত্বের অধিকার, একটি পূর্ণ রাষ্ট্র ও বিশ্বের বুকে 'বাংলাদেশি' হিসেবে পরিচয়। দীর্ঘ নয়মাস জীবন-মরণ যুদ্ধে আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা দেখিয়ে দিয়েছেন, মাতৃভূমির সম্মান রক্ষায় ও অধিকার আদায়ে দৃঢ়সংকল্প থাকলে খালি হাতেও সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীকে পরাস্ত করে বিজয় ছিনিয়ে আনা যায়। এই বিজয় দিবস তাই শুধু জয়ের নয় ঐক্য, সংকল্পেরও প্রতীক। এই দিনে পাওয়া বিজয়ের ঘোষণা, আমাদের স্বাধীনতা পরবর্তী প্রতিটি আন্দোলন ও সংগ্রাম বাংলাদেশিদের একত্র করেছে ও অনুপ্রেরণা দিয়েছে বলে আমি মনে করি।
একজন রাজনীতির শিক্ষার্থী হিসেবে, ১৬ ডিসেম্বর আমার কাছে শুধু একটি সামরিক বিজয় নয়, এটি একটি জাতির মানসিক ও মানবিক স্বাধীনতা অর্জনেরও দিন। শত বছরের বৃটিশ ও পাকিস্তানি অন্যায় শাসন ও শোষণ থেকে পরিপূর্ণ মুক্তির একটি দলিল এই মহান দিন। বিজয়ের ৫৫ বছরে এসে, ১৯৭১ এর ১৬ ডিসেম্বরের সেই মহান অর্জনকে নিজের মধ্যে ধারণ করে, আমাদের বাস্তবায়িত করতে হবে সেই বাংলাদেশ কে, যার স্বপ্নকে বুকে নিয়ে আমাদের শহিদরা জীবন দিয়েছিলেন।
একটি সুন্দর, জনমুখী,বৈষম্যহীন বাংলাদেশ যেখানে সকলের অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হবে,এমন এক বাংলাদেশ কে গড়ে তুলতে চাই সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টা। মনে রাখতে হবে,১৬ই ডিসেম্বর আমাদের যেমন মুক্তি এনে দিয়েছিলো,সেই সাথে দিয়েছিলো একটি সাম্যের বাংলাদেশ তৈরির দায়িত্ব। তা বাস্তবায়িত করা সম্ভব হলেই বিজয় দিবস পাবে তার যথাযোগ্য মর্যাদা।
তাসফিয়া শাহীন সারা চৌধুরী, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ, জাবি
বিজয় দিবস: ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং জাতিসত্তার গর্বের প্রতীক
১৬ ডিসেম্বর বিজয় দিবস। এই বিজয় অর্জন করা বাঙালির জন্য এত সহজ ছিল না। ৩০ লক্ষ শহীদের রক্ত এবং ২ লক্ষ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের এই দিন বাংলাদেশ নামক এক নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হয়।
আমার কাছে বিজয় দিবসের তাৎপর্য অন্যরকম। আমার কাছে এটি কেবল একটি জাতীয় দিবস নয়, আমাদের ইতিহাস, আত্মত্যাগ এবং জাতিসত্তার গর্বের প্রতীকও বটে। বিজয় দিবস আমাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে স্বাধীনতা সহজে আসে না, এর জন্য সাহস, ঐক্য ও পরিশ্রম দরকার। আবার স্বাধীনতা অর্জনের পর তাকে রক্ষা করাও দায়িত্বের মধ্যে পরে যায়। দিনটি স্মরণ করায় যে স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সততা, ন্যায়বোধ ও মানবিক মূল্যবোধে দেশ গড়ে তুলতে হবে।
বিজয় দিবস শুধু অতীতের গৌরব উদযাপন নয় বরং ভবিষ্যতের জন্য সচেতন ও দায়িত্বশীল নাগরিক হয়ে ওঠার অনুপ্রেরণা। স্বাধীন দেশের নাগরিক হিসেবে সকলের কর্তব্য মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করা এবং দেশের জন্য কাজ করা। বিজয় দিবস শেখায় অন্যায়ের বিরুদ্ধে কিভাবে রুখে দাঁড়াতে হয় এবং দেশের স্বার্থকে সবার উপর অগ্রাধিকার দিতে হয়। তরুণ প্রজন্মের উচিত ইতিহাস জানা, শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা রাখা এবং একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ে তোলা। বিজয় দিবস শুধু অতীতের স্মৃতি নয় বরং বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
ফাইজা আনতারা, ইংরেজি বিভাগ, জাবি
ডিসেম্বরের লাল-সবুজে লেখা বিজয়ের অঙ্গীকার
ডিসেম্বর এলেই বাংলার আকাশে ভিন্ন এক সূর্য উদয় হয়। কুয়াশার ভেতর উড়ে লাল-সবুজের পতাকা, আর মন ফিরে যায় সেই দিনের কাছে যে দিনটি আমাদের মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শিখিয়েছিল। ৫৪তম বিজয় দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এই দেশ কোনো দয়া নয় এটি অর্জিত ভূখণ্ড। ১৯৭১ সালের সেই সময় ছিল ভয় আর সাহসের মুখোমুখি দাঁড়ানোর সময়। জীবন তখন নিশ্চিত ছিল না, কিন্তু স্বপ্ন ছিল দৃঢ়। সাধারণ মানুষই হয়ে উঠেছিল অসাধারণ। কেউ অস্ত্র হাতে, কেউ সাহসে, কেউ নীরব সহমর্মিতায় সবাই মিলেই লিখেছিল বিজয়ের গল্প।
এই বিজয় শুধুই অতীতের স্মৃতি নয়। সময় যত এগোয়, বিজয়ের অর্থ তত গভীর হয়। স্বাধীনতা মানে শুধু মুক্ত ভূমি নয়— এটি নিরাপদ জীবন, ন্যায়ের আশা আর সম্মানের অধিকার। ৫৪ বছর পর দাঁড়িয়ে তাই বিজয় আমাদের শেখায়, স্বাধীনতার দায়িত্ব কখনো শেষ হয় না। এই দিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি তাদের, যাদের ত্যাগে আজকের বাংলাদেশ। পরিচিত নামের আড়ালে থেকে যাওয়া অসংখ্য মুখ যারা কোনো স্বীকৃতি চাননি, শুধু চেয়েছিলেন একটি স্বাধীন দেশ। তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ে তোলাই বিজয় দিবসের সত্যিকারের মানে।
৫৪তম বিজয় দিবস তাই আনন্দের পাশাপাশি অঙ্গীকারের দিন। বিভেদ নয় সহমর্মিতা, হতাশা নয় আস্থা, নীরবতা নয় ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানোর সাহস এই হোক আমাদের পথ। লাল-সবুজের গল্প যেন প্রতিদিনের জীবনে নতুন করে লেখা হয় এই প্রত্যাশাই আজকের বিজয় দিবসের ভাষা। বিজয় দিবসে আমরা তাই শুধু ফিরে তাকাই না সামনেও তাকাই। একটি শান্ত, ন্যায্য আর মানবিক বাংলাদেশের স্বপ্ন নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই এই দিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা। এই দেশ আমাদের। এই বিজয় আমাদেরই।
আমির ফয়সাল, আইন ও বিচার বিভাগ, জাবি