জুবাইর হোসেন, রাবি
প্রকাশ: ২৩:১৮, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫
ছবি: সংগৃহীত
১৯৭১ সালে পাকিস্তান থেকে স্বাধীনতা লাভ করলেও বাঙালি জাতি চিরকালই পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ রয়ে গেছে। এরপর স্বৈরাচারী সরকারের শৃঙ্খলে আবদ্ধ ছিল আরো ১৫ বছর। ২০২৪ সালে জুলাই-আগস্ট বিপ্লবের পর আমরা এক নতুন দেশ পেয়েছি। নতুন দেশে তাই এবারের বিজয় দিবসের আনন্দে ভিন্নমাত্রা যোগ করেছে। এ বিজয় দিবস নিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচজন শিক্ষার্থীর ভাবনা তুলে ধরা হয়েছে দ্য নেক্সট নিউজে।
১৬ ডিসেম্বর আমাদের জন্য শুধু একটি ছুটির দিন নয়, এটি স্বাধীনতা ও আত্মমর্যাদার প্রতীক। এই দিনে আমরা পেয়েছি একটি স্বাধীন দেশ, পেয়েছি নিজের ভাষায় কথা বলার, নিজের পরিচয়ে বেঁচে থাকার অধিকার। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে ১৬ ডিসেম্বর আমাকে বারবার প্রশ্ন করতে শেখায়। আমি কি এই স্বাধীনতার যথাযথ মূল্য দিচ্ছি?
মুক্তিযোদ্ধাদের ত্যাগের কথা ভাবলে মনে হয়, তাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব এখন আমাদের কাঁধে। সেই দায়িত্ব শুধু স্মৃতিচারণে সীমাবদ্ধ নয়; সততা, মানবিকতা, পরিশ্রম আর জ্ঞানের মাধ্যমে দেশকে এগিয়ে নেওয়াই তার প্রকৃত অর্থ। পড়াশোনা, নৈতিকতা ও সামাজিক দায়িত্ব পালনের মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষার্থী স্বাধীনতার চেতনাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারে। ১৬ ডিসেম্বর আমাকে অনুপ্রাণিত করে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে, সত্যকে ধারণ করতে এবং দেশের জন্য নিজেকে যোগ্য করে গড়ে তুলতে। স্বাধীনতার এই দিনে আমার অঙ্গীকার—আমি শুধু ইতিহাস জানবো না, ইতিহাসের শিক্ষা বাস্তবে প্রয়োগ করবো। কারণ একজন সচেতন শিক্ষার্থীর হাত ধরেই গড়ে উঠবে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ।

সানজিদা ইয়াসমিন মিম, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
১৬ ডিসেম্বর আমাদের বাঙালি জাতির গৌরবের একটা দিন। এই দিনে আমরা বাঙালিরা তাদের শক্তি ক্ষমতা ত্যাগ তিতিক্ষার ধারণা পাই। ১৬ ডিসেম্বর আমাদের পথচলার অনুপ্রেরণা। আমাদের পূর্ব পুরুষদের ত্যাগ আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয় এই দিনটি। যতদিন পৃথিবী থাকবে ততদিন বাঙালি জাতির ঐতিহ্য ধরে রাখতে গৌরব ধরে রাখতে ১৬ ডিসেম্বর অনুপ্রেরণা দিয়ে যাবে।
বিজয় মানে কেবল শৃঙ্খল ভাঙা নয়; এটি একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা, যেখানে ন্যায়বিচার, গণতন্ত্র, এবং মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিটি বিজয় যেন একটি আলোকিত ভবিষ্যতের পথ দেখায়, যেখানে বৈষম্য, শোষণ এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম চিরন্তন। তরুণ প্রজন্মের স্বপ্ন, এই বিজয় হোক মুক্তি ও সমতার মাইলফলক। বিজয়ের এই চেতনা কেবল ইতিহাস নয়, এটি আমাদের ভবিষ্যতেরও দিশারি। প্রতিটি মুহূর্তে আমাদের কাজ ও চিন্তায় বিজয়ের আদর্শকে প্রতিষ্ঠা করাই প্রকৃত বিজয়ের সার্থকতা।

আরিফুল ইসলাম, শিক্ষার্থী সমাজকর্ম বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তাক্ত পথ অতিক্রম করে আমরা পেয়েছি লাল সবুজে খচিত স্বাধীনতা, পেয়েছি সার্বভৌম ভূখন্ড, পেয়েছি একটা পতাকা। এই পতাকার জন্য কত রক্তে রাজপথ রঞ্জিত করতে হয়েছে তা আমরা সবাই জানি। মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বিশ্বের বুকে এনে দিয়েছে এক অনন্য পরিচয়। আমাদের গৌরব ও অহংকারের সঙ্গে বাঁচতে শিখিয়েছে। আমরা কী তার যথাযথ মূল্যায়ন করতে পারছি। বিজয়ের ৫৪ বছর পরও আমরা শহীদদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন করতে পারিনি। এ দেশ এগিয়ে যাওয়ার চেয়ে তুলনামূলক পিছিয়েই যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। আমাদের বিজয় দিবসের চেতনা শুধু ডিসেম্বর এলেই মনে আসে। বাকি এগারো মাস আমরা ভুলে থাকি। ১৬ ডিসেম্বর হোক প্রতিটি দিন, যেখানে সবাই দেশের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করতে প্রস্তুত রাখবে প্রতিনিয়ত। উৎসর্গ মানে শুধু জীবন দেওয়া নয়, বরং দুর্নীতি না করা, সঠিকভাবে আইন মান্য করা, অপরাধ থেকে দূরে থাকাও। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় হোক আমাদের পাথেয়।

হুমাইরা আক্তার, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
১৯৭১ সালের বিজয় দিবসের স্পিরিট ধারণ করে, আজকের ২৪-এর প্রজন্ম একটি এমন বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখে, যেখানে ন্যায় ও সমতার আলো সর্বত্র বিরাজ করবে। দেশের ক্ষুদ্র থেকে বৃহৎ—সব ধরনের কাঠামোতে থাকবে স্বচ্ছতা। প্রান্তিক অঞ্চলের মানুষও স্বাধীনভাবে মৌলিক অধিকার নিয়ে বাঁচতে পারবে। এই বাংলাদেশ হবে এমন এক রাষ্ট্র, যেখানে থাকবে দ্বিমত প্রকাশের স্বাধীনতা, প্রশাসনিক হয়রানি থেকে মুক্তি, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ন্যায্য মূল্য, এবং একটি অভেদ জাতি।
ঘুষের পরিবর্তে মেধার মূল্যায়ন হবে, আর সমাজ হবে বৈষম্যহীন। অর্থনীতির চালিকাশক্তি দারিদ্র্যের বেড়াজাল থেকে মুক্তি পাবে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো হবে স্বাধীন ও শিক্ষা বাণিজ্যমুক্ত। দেশে প্রতিষ্ঠিত হবে আইনের সমতা ও কার্যকর প্রয়োগ। থাকবে ক্ষমতাকে প্রশ্ন করার স্বাধীনতা এবং রাজনৈতিক দলগুলোর স্বাধীন মত ও চলাচলের অধিকার। সর্বশেষে, এমন একটি বাংলাদেশ প্রত্যাশা করি, যা হবে সবার জন্য সমান, শান্তির নীড়। সর্বত্র থাকবে শৃঙ্খলার সুর। দেশের প্রতিটি সংকটময় মুহূর্তে জাতির ঐক্য গড়ে তুলবে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্বপ্নের বাংলাদেশ।

সাদিয়া আক্তার, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
১৬ ডিসেম্বর মহান বিজয় দিবস। বাঙালি জাতির ইতিহাসের একটি অবিস্মরণীয় দিন। লাখো শহীদের রক্তে রঞ্জিত মাটি, স্বপ্ন ভাঙার কান্না, আর অসংখ্য বিপ্লবীর আত্মত্যাগে অর্জিত এ বিজয় আমাদের আত্মপরিচয় ও মুক্তির একটি মহাযুদ্ধ। দীর্ঘ ২৩ বছরের শোষণ আর নিপীড়নের বিরুদ্ধে বাঙালির নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র প্রতিরোধ ও যুদ্ধ এ দিনে পূর্ণতা পায়।
বাঙালির এ বিজয় কেবল ভৌগোলিক নয়। এটি একটি জাতির জাগরণ, এদিনে আমরা স্মরণ করি তাঁদের, যাঁরা রক্ত দিয়ে ইতিহাসের রক্তিম পৃষ্ঠা লিখেছেন। বিজয় দিবস তাই জাতীয় চেতনার শিখরে স্থাপিত এক মহাস্তম্ভ। আজকের এই দিনে বিজয়ের এই অর্জনের প্রতি সম্মান রেখে আমরা যেন শান্তিপূর্ণ স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ বিনির্মাণে সবাই সেবাব্রতী হয়ে ওঠতে পারি সেই প্রত্যাশা করি।

সাইমুন সজীব, শিক্ষার্থী, ইসলামিক স্টাডিজ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়