কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

মংক্যএ মার্মা

প্রকাশ: ১১:১৫, ৪ নভেম্বর ২০২৫

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা

ছবি: সংগৃহীত

প্রতিষ্ঠার প্রায় ১৯ বছর পর প্রথমবারের মতো কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বহুল প্রতীক্ষিত কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (কুকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন। জুলাই অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন ছাত্র সংগঠন, শিক্ষার্থী প্রতিনিধি ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের জোর দাবির প্রেক্ষিতেই এ নির্বাচন সামনে এসেছে। নির্বাচন ঘিরে যেমন রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ, তেমনি শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশাও বিস্তৃত। কুবির বিভিন্ন বিভাগের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের শিক্ষার্থীরা জানালেন তাঁদের মতামত।

স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক সংসদ চাই

সামিয়া নাজ স্বীকৃতি, শিক্ষার্থী, প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ, কুবি

কুবির মতো তুলনামূলক নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন হলে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব, নীতিনির্ধারণ ও বিভিন্ন কার্যক্রমে সরাসরি যুক্ত হওয়ার মাধ্যমে নিজেদের দক্ষতা বিকাশের নতুন সুযোগ পাবে। একই সঙ্গে কুকসু সাংস্কৃতিক ও সৃজনশীল কার্যক্রম বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে, কারণ এটি শিক্ষার্থীদের প্রতিভা প্রকাশ, সংগঠিত হওয়া এবং ক্যাম্পাসে ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তোলার একটি কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করবে। তাছাড়া একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষা, ন্যায্য প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করা এবং ক্যাম্পাসে গণতান্ত্রিক ও ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তোলার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আদিবাসীসহ সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর নিশ্চিত করুক কুকসু

ডওয়াংনুং মার্মা, শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, কুবি

আমি আশা করি কুকসু নির্বাচন খুব দ্রুত হবে, কারণ শিক্ষার্থীদের মতামত প্রকাশ ও অধিকার রক্ষার জন্য একটি প্রতিনিধিত্বমূলক সংগঠন থাকা অত্যন্ত জরুরি। নির্বাচনের মাধ্যমে অনিশ্চয়তা দূর হলে শিক্ষার্থীরা তাদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারবে, এটাই আমার প্রত্যাশা। আমার অগ্রাধিকার থাকবে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক ও প্রশাসনিক সমস্যার দ্রুত সমাধান, নিরাপদ ক্যাম্পাস ও সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা। আমি এমন নেতৃত্ব চাই যারা সবার কথা শুনবেন, দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত স্বার্থকে প্রাধান্য দেবেন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধকে শক্তিশালী করবেন। একই সঙ্গে আদিবাসী শিক্ষার্থী হিসেবে আমার প্রত্যাশা হলো—কুকসুতে এমন একটি প্ল্যাটফর্ম তৈরি হবে যেখানে আদিবাসীসহ অন্যান্য সংখ্যালঘু শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বরও শোনা হবে। ক্যাম্পাসে সবাই সমান সুযোগ ও অধিকার ভোগ করবে, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে সম্মান জানিয়ে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ গড়ে উঠবে। কুকসু শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ নয়, বরং সব শিক্ষার্থীর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করলেই তা সত্যিকার অর্থে কার্যকর হবে।

নেতৃত্ব নয়, অনুসারী তৈরি করছে সংসদহীনতা

আব্দুল গাফ্ফার ফুয়াদ, শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, কুবি

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদের অনুপস্থিতি এক দীর্ঘ নীরব শূন্যতা—যেখানে শিক্ষার্থীরা নেতৃত্ব শেখার আগেই কেবল অনুসারীতে পরিণত হচ্ছে। সংসদহীন প্রজন্ম শুধু সংগঠনের অভাব নয়, হারায় যুক্তির আলোচনার অভ্যাস, ন্যায়ের জন্য সম্মিলিত কণ্ঠ তোলার সাহস। অথচ অক্সফোর্ড, হার্ভার্ডের মতো বিশ্বমানের বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ শিক্ষার্থীদের আত্মাকে জাগিয়ে তোলে, শেখায় যুক্তির লড়াই, ন্যায়ের ভাষা এবং বৃহত্তর কল্যাণের দর্শন। কুকসু যদি গঠিত হয়, তবে তা হবে প্রশাসন ও শিক্ষার্থীর সেতুবন্ধন, একাডেমিক মর্যাদা এবং সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতীক। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ থাকবে—বাইরের রাজনৈতিক আগ্রাসন। যদি দলীয় স্বার্থের বিষ ঢুকে পড়ে, তবে কুকসু আলোকবর্তিকা নয়, কেবল আরেকটি রাজনৈতিক মুখোশে পরিণত হবে।

সনাতনী শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষিত হবে কুকসুতে

শ্রাবণী রানী দাস, শিক্ষার্থী, মার্কেটিং বিভাগ, কুবি

নারী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হলে ক্যাম্পাসে সমতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পরিবেশ তৈরি হবে। অনেক সময় নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা, আবাসন, স্বাস্থ্যসেবা ও মানসিক সহায়তার মতো সমস্যাগুলো প্রাধান্য পায় না। একজন নারী প্রতিনিধি থাকলে এসব বিষয় সরাসরি আলোচনায় আসবে এবং সমাধান সম্ভব হবে। একইভাবে সনাতনী শিক্ষার্থীদের প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত হলে তাদের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক অধিকার সুরক্ষিত হবে। দুর্গাপূজা, সরস্বতী পূজা বা অন্যান্য উৎসবে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা, সময়সূচি সমন্বয় এবং নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এতে সনাতনী শিক্ষার্থীরা আরও স্বাচ্ছন্দ্যে ও গর্বের সাথে নিজেদের সংস্কৃতি চর্চা করতে পারবে।কুকসু হল সুবিধা বাড়ানো, নিরাপত্তা জোরদার, স্বাস্থ্যকেন্দ্র উন্নয়ন এবং সাংস্কৃতিক ও ক্রীড়া কার্যক্রমে নারী শিক্ষার্থীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে পারে। আমার মতে কুকসুর প্রধান দায়িত্ব হবে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত প্রতিনিধি হয়ে তাদের দাবি প্রশাসনের কাছে তুলে ধরা এবং ক্যাম্পাসে একটি গণতান্ত্রিক, নিরাপদ ও অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ গড়ে তোলা।

শিক্ষার্থীদের অভিন্ন স্বার্থ রক্ষার মঞ্চ হোক কুকসু

বীরেন্দ্র বড়ুয়া, শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, কুবি

আমাদের দেশে শিক্ষিত, সৃজনশীল ও মানবিক গুণাবলিসম্পন্ন দেশনেতা গড়ে তোলার জন্য ছাত্রাবস্থা থেকেই নেতৃত্বদানের অনুশীলন করা প্রয়োজন। কুকসু নির্বাচনে বিজয়ী প্রার্থীরা বর্তমান সময় থেকেই তার মেধা ও দক্ষতার পরিসর বিস্তৃত করার সুযোগ পাবে। যেহেতু কুকসু একটি রাজনীতিমুক্ত সাধারণ শিক্ষার্থীদের নির্বাচন, তাই এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা তাদের একাডেমিক সমস্যাগুলো সরাসরি উপস্থাপন করতে পারবে। এর ফলে পাঠদান, গবেষণা ও পরীক্ষা–ব্যবস্থার মানোন্নয়ন সম্ভব হবে। পাশাপাশি সাংস্কৃতিক, ক্রীড়া ও সহশিক্ষা কার্যক্রমে আসবে গতিশীলতা, কারণ নির্বাচিত প্রতিনিধিরা এসব কার্যক্রমের পৃষ্ঠপোষকতা ও তদারকি করতে পারবেন। এই লক্ষ্যে ছাত্র সংসদকে হতে হবে শিক্ষার্থীদের অভিন্ন স্বার্থরক্ষাকারী একটি প্ল্যাটফর্ম, যেখানে থাকবে সততা ও দায়বদ্ধতা, একাডেমিক উৎকর্ষতা ও সহশিক্ষা কার্যক্রমের প্রতি সমান গুরুত্ব, মুক্তমনা ও সহনশীলতা, গণতান্ত্রিক মানসিকতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা।

শিক্ষার্থীদের কল্যাণে বাস্তবমুখী ও জবাবদিহিমূলক কুকসু কাম্য

তাছপিক জাহিন রাফী, শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স এন্ড ব্যাংকিং বিভাগ, কুবি

কুকসু যদি রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেয়, তবে এটি শিক্ষার্থীদের একাডেমিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক স্বার্থ রক্ষায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। পরিবহন সংকট নিরসন, লাইব্রেরিতে পর্যাপ্ত বই ও আন্তর্জাতিক গবেষণাপত্রের ব্যবস্থা, আবাসনে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং স্বাস্থ্যসেবায় প্রয়োজনীয় উপকরণ সরবরাহে কুকসু দৃশ্যমান পদক্ষেপ  নিতে পারবে। আমি চাই কুকসু শুধু নামসর্বস্ব না হয়ে বাস্তবমুখী, দায়িত্বশীল ও জবাবদিহিমূলক হোক এবং শিক্ষার্থীদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে তাদের সমস্যার সমাধানে সক্রিয়ভাবে কাজ করুক।

সম্পর্কিত বিষয়:

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন