টিএনএন ডেস্ক
প্রকাশ: ১৮:২৭, ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
ইসলামের ইতিহাসে কিছু রাত রয়েছে, যেগুলো আল্লাহ তায়ালার বিশেষ করুণা, অনুগ্রহ ও ক্ষমা লাভের সুযোগ এনে দেয়। শবে বরাতও সেই মহিমান্বিত রাতগুলোর মধ্যে একটি।
হাদিসে এ রাতকে বলা হয়েছে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’। এই রাতে আল্লাহ তায়ালা অসংখ্য বান্দাকে ক্ষমা করেন, রিজিক বৃদ্ধি করেন এবং আকাশ-জমিনে রহমতের দরজা খুলে দেন। তবে কুরআন ও সহিহ হাদিসের আলোকে জানা যায়, এই মহামূল্যবান রাতেও এমন কিছু মানুষ রয়েছেন, যাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার রহমতের দৃষ্টি পড়ে না। তারা এমন কাজের সাথে যুক্ত থাকেন, যা আল্লাহর ক্ষমা থেকে তাদের বিরত রাখে।
তবুও, যারা তওবা করে এবং আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করে, আল্লাহ তায়ালা তাদেরও ক্ষমা করে দেন।
এমন দুর্ভাগা যারা
মুশরিক: যে ব্যক্তি শিরকে লিপ্ত থাকে, তার জন্য ক্ষমার দরজা বন্ধ থাকে। শিরক হলো একটি গুরুতর পাপ, যার ক্ষমা না করার কথা আল্লাহ তায়ালা নিজেই ঘোষণা করেছেন।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, নিশ্চয়ই আল্লাহ তাকে ক্ষমা করেন না, যে তার সঙ্গে শিরক করে। আর এরচেয়ে কম অপরাধ যাকে ইচ্ছা তিনি ক্ষমা করেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সঙ্গে অংশীদার সাব্যস্ত করল, সে এক গুরুতর পাপে লিপ্ত হলো। (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৮)
মুশাহিন (বিদ্বেষ পোষণকারী): মুশাহিন হলো সেই ব্যক্তি যার অন্তর হিংসা, বিদ্বেষ ও শত্রুতায় পূর্ণ। কোনো বৈধ দ্বীনি কারণ ছাড়া অন্যের প্রতি শত্রুতা করা মারাত্মক পাপ।
ইমাম আওজায়ি (রহ.) বলেন, সাহাবায়ে কেরামের প্রতি অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারীও মুশাহিনের অন্তর্ভুক্ত।
হজরত আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, পারস্পরিক বিদ্বেষে লিপ্ত দুই ব্যক্তি একে অপরের সঙ্গে মীমাংসা না করা পর্যন্ত তাদের ক্ষমা স্থগিত থাকে। (সহিহ মুসলিম, হাদিস: ২৫৬৫)
হত্যাকারী: ইচ্ছাকৃতভাবে মানুষকে হত্যা করা ইসলামে ভয়াবহতম অপরাধগুলোর একটি। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ অপরাধকে কুফরের সঙ্গে তুলনা করেছেন। হজরত ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, নবীজি (সা.) ইরশাদ করেছেন, “মুসলমানকে গালি দেওয়া পাপ, আর তাকে হত্যা করা কুফরি।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৭০৭৬)
হত্যা ধ্বংসাত্মক গুনাহের অন্তর্ভুক্ত, যা মানুষকে সর্বনাশের দিকে নিয়ে যায়। হজরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “তোমরা ধ্বংসকারী সাতটি গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। সাহাবায়ে কেরাম জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসুল! সেগুলো কী? তিনি বললেন, আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা, জাদু করা, আল্লাহ তায়ালা যে প্রাণ হত্যা করতে নিষেধ করেছেন অন্যায়ভাবে তা হত্যা করা, সুদের লেনদেন করা, এতিমের সম্পদ আত্মসাৎ করা, যুদ্ধের দিন যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পলায়ন করা ও সতীসাধ্বী নারীর প্রতি অপবাদ দেওয়া।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ২৭৬৬)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী: রক্তের সম্পর্ক ছিন্ন করা কবিরা গুনাহ। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, “ক্ষমতা লাভ করলে সম্ভবত তোমরা পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করবে এবং আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করবে। এদের প্রতিই আল্লাহ অভিসম্পাত করেন, অতঃপর তাদের বধির ও দৃষ্টিহীন করেন।” (সুরা মুহাম্মদ, আয়াত: ২২-২৩)
হজরত জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৯৮৪)
আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর কোনো আমল আল্লাহর দরবারে গ্রহণযোগ্য হয় না, ফলে শবে বরাতসহ অন্য ফজিলতপূর্ণ রাতেও তারা ক্ষমার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিত থাকে।
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, “প্রতি বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে আদম সন্তানের আমল আল্লাহর দরবারে উপস্থাপন করা হয়। তখন আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারীর আমল গ্রহণ করা হয় না।” (আদাবুল মুফরাদ, হাদিস: ৬১)
টাখনুর নিচে কাপড় পরিধানকারী: পুরুষদের জন্য- টাখনুর নিচে কাপড় ঝুলিয়ে রাখা শরিয়তে নিষিদ্ধ। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছেন।
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে ওমর (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, “যে ব্যক্তি অহংকারবশত কাপড় ঝুলিয়ে হাঁটে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তার দিকে দৃষ্টি দেবেন না।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩৬৬৫)
অন্য হাদিসে নবীজি (সা.) বলেন, “পুরুষের টাখনুর নিচের যে অংশ কাপড় দ্বারা আবৃত থাকবে তা জাহান্নামে যাবে।” (সুনানে নাসায়ি, হাদিস: ৫৩৩১)
এ ছাড়া পিতামাতার অবাধ্য সন্তান, ব্যভিচারে লিপ্ত ব্যক্তি ও নেশাগ্রস্ত লোকেরাও শবে বরাতের ক্ষমা থেকে বঞ্চিত হবে।
তবে আল্লাহ তায়ালার রহমত অপরিসীম। কেউ যদি আন্তরিক অনুশোচনার সঙ্গে তওবা করে, পাপ পরিত্যাগ করে এবং ভবিষ্যতে আর পাপের পথে ফিরে না যাওয়ার দৃঢ় অঙ্গীকার করে, তা হলে আল্লাহ তায়ালা তাকেও ক্ষমা করবেন।
পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে, আর যারা তওবা করে, ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, আল্লাহ তাদের গুনাহগুলো নেকিতে পরিবর্তন করে দেন। (সুরা ফুরকান: ৭০)
জিএ