ক্যানসার চিকিৎসায় সংকট টাকায় নয়, সিস্টেমে: স্বাস্থ্য উপদেষ্টা

টিএনএন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫:৪১, ২৭ অক্টোবর ২০২৫

ক্যানসার চিকিৎসায় সংকট টাকায় নয়, সিস্টেমে: স্বাস্থ্য উপদেষ্টা

ছবি: সংগৃহীত

দেশে ক্যানসার চিকিৎসায় সংকট বা বাধা শুধু মেশিন বা অর্থের অভাবে নয় বরং সিস্টেমের ভেতরে থাকা ত্রুটি ও অনিয়মের কারণে এই সংকট বলে মন্তব্য করেছে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা নূরজাহান বেগম।

সোমবার জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় তিনি একথা বলেন।

স্বাস্থ্য উপদেষ্টা বলেন, হাসপাতালের পরিবেশ ওপরে থেকে সুন্দর লাগলেও নিচে গিয়ে যখন রোগীদের কষ্ট দেখি, তখন বোঝা যায়, এই সিস্টেমটাই আমাদের আটকে রাখছে। যে পরিবারে ক্যানসার নেমে আসে, তাদের জীবনে এটি ভয়াবহ বিপর্যয় বয়ে আনে। তাই এখনই সময় চিকিৎসা ব্যবস্থার ভেতরে যে অদক্ষতা ও অপচয় আছে, তা পরিবর্তন করার।

নূরজাহান বেগম আরও বলেন, প্রিভেনশন বা প্রতিরোধকে আমরা অবহেলা করছি। আগে প্রিভেনশনের জন্য যে বাজেট ছিল, এখন তা কমছে। স্কুল পর্যায় থেকেই মেয়েদের শেখাতে হবে, কীভাবে নিজের শরীর পরীক্ষা করতে হয়। তারা যদি জানে, তাহলে পরিবারেও সচেতনতা ছড়িয়ে পড়বে।

তামাকজনিত ক্যানসার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তামাকের কারণে যত ক্যানসার হচ্ছে, তার চিকিৎসায় ব্যয়িত অর্থ তামাক থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের চেয়েও অনেক বেশি। তাই ধীরে ধীরে তামাকমুক্ত সমাজ গড়তে হবে।

ক্যানসার চিকিৎসায় মেশিন ক্রয় প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তোলে তিনি বলেন, একটি মেশিনের দাম ২৪ কোটি, অন্যটির ৩৮ কোটি টাকা, মান প্রায় একই, কিন্তু দামের পার্থক্য ১৪ কোটি কেন? কারণ সিস্টেমে এমন কিছু শর্ত জুড়ে দেওয়া হয় যা বাস্তবে প্রয়োজনের চেয়ে অনেক ব্যয় বাড়িয়ে দেয়। আমাদের ভাবতে হবে, এই সিস্টেম থেকে কীভাবে মুক্তি পাওয়া যায়।

হাসপাতালের ব্যবস্থাপনা ও শৃঙ্খলার বিষয়েও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন। বলেন, একজন রোগীর সঙ্গে কতজন অ্যাটেনডেন্ট থাকবে, তা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মিডিয়া বা বহিরাগতদেরও হাসপাতালের ইনডোরে অবাধ প্রবেশের সুযোগ থাকা উচিত নয়। হাসপাতালগুলোকে হাসপাতালের মতো রাখতে হবে।

উপদেষ্টা আরও বলেন, আমাদের যদি ফুলের তোড়ায় ১৫-১৬ শত টাকা ব্যয় করার অভ্যাস থাকে, তবে সেই অর্থ রোগীর চিকিৎসায় ব্যবহার করা গেলে অনেক বেশি অর্থবহ হত।

নূরজাহান বেগম তার বক্তব্যে আরও বলেন, এই হাসপাতালেই আগে ছয়টি লিনাক মেশিন ছিল, এখন চলছে মাত্র দুটি। আরও দুটি আসার কথা থাকলেও সিস্টেমগত কারণে দেরি হচ্ছে। আমি ইতিমধ্যেই নির্দেশ দিয়েছি। আপনারা চাহিদাপত্র দিন, যত দ্রুত সম্ভব ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তিনি বলেন, হাসপাতাল শুধু চিকিৎসকদের নয়, আমাদের সবার দায়িত্ব। আমরা যদি সবাই মিলেমিশে কাজ করি, তাহলে এই সিস্টেম বদলানো সম্ভব। পরিবর্তন আনতে সাহস ও সততার সঙ্গে এগোতে হবে।

স্বাস্থ্য সচিব সাইদুর রহমান বলেন, দেশে ক্যানসার সেবার সক্ষমতা এখনও সীমিত। ১৭ কোটি মানুষের জন্য কয়েকটি হাসপাতাল যথেষ্ট নয়। রোগীরা মহাখালীতে এসে রাস্তায় ঘুমান, ভর্তি হওয়ার জন্য লাইনে দাঁড়ান। এ বাস্তবতা আমাদের কষ্ট দেয়, কিন্তু সমাধান খুঁজতে হবে। স্ক্রিনিং ও চিকিৎসাসেবা বিকেন্দ্রীকরণ এখন সময়ের দাবি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. আবু জাফর বলেন, প্রতি বছর দেশে প্রায় ১৩ হাজার নারী স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হন, যার অর্ধেকই দেরিতে শনাক্ত হন। সময়মতো স্ক্রিনিং ও সচেতনতা বাড়াতে পারলে অনেক জীবন বাঁচানো সম্ভব।

তিনি আরও জানান, বর্তমানে বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে মেমোগ্রাফি ও আল্ট্রাসোনোগ্রামের মাধ্যমে স্ক্রিনিংয়ের ব্যবস্থা রয়েছে। তবে লজ্জা, ভয় এবং অজ্ঞতার কারণে অনেক নারী চিকিৎসকের কাছে দেরিতে যান।

স্তন ক্যানসার সচেতনতা মাস উপলক্ষে জাতীয় ক্যান্সার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল এই আলোচনা সভায়র আয়োজন করে। এতে অংশ নিয়ে বক্তারা সবাই প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্তকরণ, স্ক্রিনিং সেবা সম্প্রসারণ, চিকিৎসা সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রশাসনিক সংস্কারের ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

জিএ

আরও পড়ুন