ডেস্ক রিপোর্ট
প্রকাশ: ২২:৩৬, ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৫
ছবি: সংগৃহীত
সাত দফা অঙ্গীকারনামার ভিত্তিতে জুলাই জাতীয় সনদের চূড়ান্ত খসড়া প্রস্তুত করেছে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন।
এই খসড়ায় সই করলে রাজনৈতিক দলগুলো আদালতে এর বৈধতা বা প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
বৃহস্পতিবার (১১ সেপ্টেম্বর) রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে খসড়াটি পাঠানো হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কিছু বিষয়ে ভিন্নমত (নোট অব ডিসেন্টসহ) থাকলেও মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব নিয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক আলী রীয়াজ জানান, রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর চূড়ান্ত ভাষ্য পাঠানো হয়েছে এবং এতে সবার মতামতের প্রতিফলন ঘটানো হয়েছে।
আলী রীয়াজ বলেন, দলগুলোকে বলা হয়েছে, তারা যেন আগামী ১৩ সেপ্টেম্বর বিকেল ৫টার মধ্যে স্বাক্ষরের জন্য দুইজন প্রতিনিধির নাম কমিশনে পাঠায়। স্বাক্ষরকারী দলগুলো অঙ্গীকার করবে যে, সনদ বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে। তবে প্রাথমিক খসড়ায় থাকা আইনি বাধ্যবাধকতার প্রস্তাব চূড়ান্ত খসড়ায় বাদ দেওয়া হয়েছে।
প্রাথমিক খসড়ায় বলা হয়েছিল, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর প্রতিটি বিধান, প্রস্তাব ও সুপারিশ সাংবিধানিক ও আইনগতভাবে বলবৎ হিসেবে গণ্য হবে বিধায় এর বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা কিংবা জারির কর্তৃত্ব সম্পর্কে কোনো আদালতে প্রশ্ন তোলা যাবে না।
কিন্তু চূড়ান্ত খসড়ায় বলা হয়েছে, সনদটি সংবিধানে ‘তফসিল হিসেবে বা যথোপযুক্তভাবে’ যুক্ত করা হবে এবং স্বাক্ষরকারী দলগুলো এর বৈধতা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তুলতে পারবে না।
অঙ্গীকারনামায় উল্লেখ আছে, অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য বিষয়গুলো অহন্তর্বর্তীকালীন সরকার কার্যকর করবে।
প্রাথমিক খসড়ায় আটটি বিষয়ের প্রতিশ্রুতি ছিল, যেখানে বলা হয়েছিল—“এ সনদের সকল বিধান, নীতি ও সিদ্ধান্ত সংবিধানে অন্তর্ভুক্তকরণ নিশ্চিত করব এবং বিদ্যমান সংবিধান বা অন্য কোনো আইনে ভিন্নতর কিছু থাকলে এই সনদের বিধান/প্রস্তাব/সুপারিশ প্রাধান্য পাবে।” জামায়াতে ইসলামী, জুলাই আন্দোলনের নেতা ও এনসিপির দাবিতে এই শর্ত যুক্ত করা হয়েছিল, কারণ তারা চেয়েছিল সনদের একটি শক্তিশালী আইনি ভিত্তি থাকতে হবে। তবে বিএনপিসহ কয়েকটি দল এর বিরোধিতা করায় চূড়ান্ত খসড়ায় এটি পরিবর্তন করে কেবল ‘তফসিল আকারে’ অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
চূড়ান্ত সমন্বিত খসড়া রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে পাঠানো হয়েছিল, ২২ অগাস্ট পর্যন্ত মতামত জানানোর সময় দিয়ে। এরপরও ভিন্নমতের খবর আসে। সবশেষ সমন্বয় শেষে ৪ সেপ্টেম্বর রাজনৈতিক দলগুলোর হাতে স্বাক্ষরের জন্য খসড়া তুলে দেওয়া হয়।
কমিশন জানিয়েছে, রাজনৈতিক দলের পাশাপাশি ঐকমত্য কমিশনের সদস্যরাও সনদে স্বাক্ষর করবেন।
চূড়ান্ত খসড়ায় উল্লেখ আছে, মোট ৩৩টি রাজনৈতিক দল ও জোট জুলাই সনদে একমত হয়েছে, যার মধ্যে ১২ দলীয় জোটও রয়েছে। কমিশনের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ২০ মার্চ থেকে ১৯ মে পর্যন্ত প্রথম ধাপে ৩২টি দল ও জোটের সঙ্গে ৪৪টি বৈঠক হয়েছে। কিছু দলের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করতে হয়েছে। এরপর গুরুত্বপূর্ণ ২০টি বিষয় নিয়ে দ্বিতীয় ধাপে ৩০টি দল ও জোটের সঙ্গে আলোচনা হয় এবং সেই মতামতই চূড়ান্ত খসড়ায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
জুলাই সনদের বাস্তবায়নের অঙ্গীকারনামায় বলা হয়েছে, জনগণের অধিকার ও গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থানে রক্তদান ও ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত সুযোগকে সম্মান জানিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫ পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করা হবে। জনগণ রাষ্ট্রের মালিক এবং তাদের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন। আলোচনার মাধ্যমে গৃহীত এই সনদ সংবিধানে তফসিল হিসেবে বা যথাযথভাবে যুক্ত করা হবে। সনদের বৈধতা ও প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আদালতে প্রশ্ন তোলা হবে না এবং বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপে আইনি ও সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা হবে।
এতে আরও বলা হয়েছে, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সংগ্রাম এবং ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক তাৎপর্যকে সাংবিধানিক ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেওয়া হবে।
গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের বিচার, শহীদদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদা, শহীদ পরিবারের সহায়তা, আহতদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসন নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে সংবিধান, বিচারব্যবস্থা, নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রশাসন, পুলিশ ও দুর্নীতি দমন ব্যবস্থাসহ রাষ্ট্রের সার্বিক কাঠামো সংস্কারের জন্য প্রয়োজনীয় সংশোধন, সংযোজন, নতুন আইন ও বিধি প্রণয়ন করা হবে।
সবশেষে রাজনৈতিক দলগুলো একমত হয়েছে যে, জুলাই জাতীয় সনদ ২০২৫-এর ঐকমত্যের ভিত্তিতে গৃহীত অবিলম্বে বাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্তগুলো দ্রুততম সময়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কার্যকর করবে।
জিএ