দুই মার্কেট থেকে বছরে ১৮ কোটি টাকা আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে ঢাবি

টিএনএন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৭:৪৩, ১১ ডিসেম্বর ২০২৫

দুই মার্কেট থেকে বছরে ১৮ কোটি টাকা আয়ের সুযোগ হারাচ্ছে ঢাবি

ছবি: সংগৃহীত

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মালিকানাধীন ‘বিশ্ববিদ্যালয় মার্কেট, কাটাবন’ ও ‘গ্রীন সুপার মার্কেট’-এ ভাড়া বরাদ্দে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও সিন্ডিকেট দৌরাত্মের কারণে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণের আয় থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়। এসব মার্কেটের দোকান মাত্র কয়েক হাজার টাকায় ভাড়া নিয়ে চুক্তি-বহির্ভূতভাবে মাসে তার চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকায় তৃতীয় পক্ষের কাছে বছরের পর বছর ধরে ভাড়া দিয়ে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব সম্পদ হওয়া সত্ত্বেও সেকেলে নীতিমালা, চরম উদাসীনতা ও সদিচ্ছার অভাবের কারণে এই দুই প্রতিষ্ঠান থেকে প্রতিবছর অন্তত সাড়ে ১৮ কোটি টাকা হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে। এতে অনেকের কাছে বিষয়টি উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, প্রশ্ন উঠেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের জন্য আবাসিক হল, গ্রন্থাগার, গবেষণাগারসহ কোনো উন্নয়ন প্রকল্পের দাবি উঠলেই কর্তৃপক্ষ সাধারণত জবাবে বাজেট সংকটের দোহাই দিয়ে থাকে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এত বড় দুই মার্কেটের মতো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক সম্পদ রয়েছে, যেগুলোর সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়কে বহির্বিশ্বের প্রতিষ্ঠানগুলোর মতো স্বয়ংসম্পূর্ণ করা সম্ভব। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকেই দায়ী করছেন তারা।

জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মালিকানায় রাজধানীর কাটাবনে ৩৫৩ দোকানবিশিষ্ট দ্বিতল মার্কেট রয়েছে। অন্যদিকে, রাজধানীর অন্যতম ব্যস্ত ও বাণিজ্যিক এলাকা ফার্মগেটে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক প্রতিষ্ঠান চারতলা ভবনবিশিষ্ট গ্রীণ সুপার মার্কেট, যেখানে ১৫৩টি দোকান রয়েছে। কাটাবন মার্কেটের দোকানপ্রতি সাড়ে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার টাকা ও গ্রীণ সুপার মার্কেটের দোকানের আয়তনভেদে ১০ থেকে ২০ হাজার টাকামূল্যে ভাড়া নিয়ে একটি সিন্ডিকেট ৩০ থেকে ৫৫ হাজার পর্যন্ত টাকায় ভাড়া দিচ্ছে, যা সম্পূর্ণভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের দোকান বরাদ্দ নীতিমালা বহির্ভূত। সিন্ডিকেটটি পরিচালনা করে মার্কেটগুলোর মালিক সমিতি। তবে এ সিন্ডিকেট মোকাবেলা এবং বর্তমান বাজার অনুযায়ী মার্কেট পরিচালনায় বিশ্ববিদ্যালয় কোনো কার্যকর পদক্ষেপই গ্রহণ করছে না। এক্ষেত্রে পদক্ষেপ থাকলে বিশ্ববিদ্যালয় কোষাগারে বছরে ২২ কোটি টাকারও বেশি যুক্ত হত।

কাটাবন মার্কেটে গিফট ও অ্যাওয়ার্ড আইটেম, ফুল, পশুপাখি, অ্যাকুরিয়াম, ফার্নিচার এবং মোটরসাইকেলের সার্ভিসিংসহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান রয়েছে। এগুলোর বেশিভাগেরই আয়তন ১৬০ থেকে ১৮০ স্কয়ার ফুট (বর্গফুট) করে। এগুলো বিভিন্ন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের কাছে সুলভ মূল্যে ভাড়া এবং ইজারা দিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়।

তাদের কাছ থেকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিমাসে দোকানপ্রতি ২২ টাকা স্কয়ার ফুট মূল্যে ভাড়া আদায় করে। সে হিসেবে দোকানগুলোর আয়তন গড়ে ১৭০ স্কয়ার ফুট ধরা হলে প্রতি দোকান থেকে মাসে বিশ্ববিদ্যালয় ভাড়া পায় মাত্র ৩ হাজার ৭৪০ টাকা করে। এ হিসেবে ৩৫৩টি দোকান থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পায় মোট ১৩ লাখ ২০ হাজার ২২০ টাকা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কাটাবন মার্কেটের আশেপাশের এলাকা- যেমন: কাটাবন মোড়, শাহবাগ, হাতিরপুল ও বাটা সিগন্যাল এলাকার ১৭০ স্কয়ার ফুট আয়তনের দোকানগুলো ভাড়া নিতে ৩ থেকে ১০ লাখ টাকা জামানত দিয়ে দোকান নেওয়ার পর মাসিক ভাড়া হিসেবে অবস্থানভেদে ৩৫ থেকে ৫৫ হাজার টাকা বা তার বেশিও ভাড়া দিতে হয়। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয় কাটাবন মার্কেটের দোকানগুলো থেকে যে ভাড়া পাচ্ছে, সেটির পরিমাণ আশেপাশের দোকানগুলোর ১০ থেকে ১২ গুণেরও কম।

সূত্র বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় ৩ হাজার ৭৪০ টাকা করে ভাড়া পেলেও এ মার্কেটের প্রতিটি দোকান থেকে ৩০ থেকে ৪০ হাজার টাকা পর্যন্ত ভাড়া নেওয়া হয়। কারা এ ভাড়া নেয় সে ব্যাপারে মার্কেটের দোকানদারদের কাছে কৌশলে জানতে চাইলে তারা জানান, দোকানগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছ থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ভাড়া নিয়ে তৃতীয় পক্ষকে অর্থাৎ তাদের কাছে ভাড়া দেয়।

তাদের (ভাড়াটিয়া) কাছ থেকে শুরুতে মোটা অংকের জামানত নিয়ে প্রতি মাসে দোকানপ্রতি ভাড়া নেওয়া হয় ৩০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। এক্ষেত্রে প্রতি দোকানের ভাড়া গড়ে ৩৫ হাজার টাকা করে ধরা হলেও ৩৫৩ দোকান থেকে মাসে ১ কোটি ২৩ লাখ ৫৫ হাজার টাকা আসে, যার হিসেব ১ বছরে ১৪ কোটি ৮২ লাখ ৬০ হাজার টাকা দাঁড়ায়।

দোকানদাররা জানান, কোনো কোনো ব্যক্তির নিয়ন্ত্রণে একাধিক দোকান রয়েছে। এ বিষয়ে পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক এক দোকানদার বলেন, কারো কারো ১৫ থেকে ১৭টি দোকান থাকার কথাও শুনেছি। তারা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও আর্থিক প্রভাব খাটিয়ে এগুলো বরাদ্দ নিয়েছেন এবং ভাড়া দিয়ে যাচ্ছেন। তাদের দাবি, মার্কেট যতদিন থাকবে, ততদিন তাদের স্থায়ী মালিকানা সত্ত্ব কিনে নেওয়া আছে। যদিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিসের ম্যানেজার (ভারপ্রাপ্ত) ফাতেমা বিনতে মুস্তাফা দ্য ডেইলি ক্যাম্পাসকে জানান, কোনো ব্যক্তি ২টি এবং প্রতিষ্ঠান ৫টির বেশি দোকান নিতে পারে না।

অন্যদিকে, স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে নির্মিত হয় ফার্মগেটের গ্রীণ সুপার মার্কেট। চার তলা ভবনবিশিষ্ট এ মার্কেটে বিভিন্ন আয়তনের মোট ১৫৮ টি কক্ষ বা দোকান রয়েছে। যেগুলোতে সেনিটারি আইটেম, বিভিন্ন অফিস, চিকিৎসালয়সহ বিভিন্ন পণ্যের দোকান ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে মেসার্স আবদুস সাত্তার এন্ড ব্রাদার্স কোম্পানির কাছে ২১ বছরের মেয়াদে ইজারা দিয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। এক সূত্র জানায়, এই প্রতিষ্ঠানটিই এ মার্কেট নির্মাণ করে দেয়, যার বিনিময়স্বরূপ ২১ বছরের মেয়াদে ইজারা দেওয়া হয়। যেটির মেয়াদ শেষ হয় ১৯৯৭ সালে।

/এআর

আরও পড়ুন