‘এখানে সিনেমা দেখতে টিকিট লাগে না’

টিএনএন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫:৩৩, ২৮ অক্টোবর ২০২৫

‘এখানে সিনেমা দেখতে টিকিট লাগে না’

ছবি: সংগৃহীত

পঞ্চাশোর্ধ্ব শফিক হাসান। পেশায় চাকরিজীবী। সারাদিনের ব্যস্ত অফিসজীবন শেষে তাঁর মনটা প্রায়ই ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই প্রতি বৃহস্পতিবার বিকেলের অপেক্ষায় থাকেন তিনি। অফিস শেষে মিরপুর থেকে চলে আসেন আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ভবনে বিনা পয়সায় সিনেমা দেখতে। সঙ্গে থাকেন তাঁর দুই বন্ধু। তাদের জন্য এই ছোট্ট সময়টাই যেন এক অন্যরকম আনন্দের খোরাক।

শুধু শফিকই নন, তাঁর মতো আরও অনেকেই সপ্তাহের এই একদিনকে ধরে রেখেছেন সিনেমা দেখার উৎসব হিসেবে। প্রতি বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ ভবনের প্রজেকশন হলে প্রদর্শিত হয় পুরোনো বাংলা সিনেমা, যে সিনেমাগুলো একসময় দর্শক হৃদয়ে দাগ কেটেছিল। এখানে কোনো টিকিট লাগে না, শুধু আগ্রহ আর ভালোবাসা থাকলেই দেখা যায় এসব ক্ল্যাসিক ছবি।

গত বৃহস্পতিবার প্রদর্শিত হলো নব্বই দশকের সাড়া জাগানো সিনেমা ‘বেদের মেয়ে জোসনা’। ১৯৮৯ সালের ৯ জুন সিনেমাটি মুক্তি পেয়েছিল। এ সিনেমার আয়ের রেকর্ড এযাবত এ দেশের অন্য কোনো সিনেমার পক্ষে ভাঙা সম্ভব হয়নি। এটি বাংলা চলচ্চিত্র ইতিহাসে একক অনন্য মাইলফলক হয়ে আছে। তোজাম্মেল হক বকুল পরিচালিত এ সিনেমায় ইলিয়াস কাঞ্চন ও অঞ্জুর অভিনয় দর্শক প্রশংসিত হয়।  

সাড়ে তিন দশক আগের এই সিনেমা দেখতে হলে ছিল দর্শকে পরিপূর্ণ। পর্দা আলোকিত হতেই করতালিতে মুখরিত হয়ে উঠল পুরো থিয়েটার। সিনেমা শুরুর সময় অনেকেই গুনগুন করে গেয়ে উঠলেন ‘বেদের মেয়ে জোসনা আমায় কথা দিয়েছে...।’

শফিক  বললেন, “এটি আমাদের সময়ের সিনেমা, কিন্তু এত বছর পর আবার বড় পর্দায় দেখে মনে হচ্ছে আমি যেন আবার তরুণ হয়ে গেছি।’ পাশে বসা তাঁর বন্ধু তমাল যোগ করলেন, ‘টাকা দিয়ে যত সিনেমা দেখি, এমন তৃপ্তি পাই না। এখানে এসে মনে হয় নিজের সময়কে ছুঁয়ে দেখছি।”

আগাঁরগাও পরিবেশ অধিদপ্তরে চাকরি করেন সুফল আহমেদ। তাঁর অফিসের কাছেই ফিল্ম আর্কাইভ ভবন। অফিস শেষ করে এসেছেন বেদের মেয়ে জোসনা সিনেমা দেখতে। তিনি বলেন, “ইউটিউবে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ অনেক দেখেছি। প্রথমবার সিনেমাটি বড়পর্দায় দেখতে কোনো হলে এসেছি। আমার বাড়ি বগুড়ার সোনাতলায়। দীর্ঘদিন সেখানে কোনো হল নেই।  মন চাইলেও হলে সিনেমা দেখতে পারিনি। অনেক আনন্দ নিয়ে ফিল্ম আর্কাইভ ভবনে ‘বেদের মেয়ে জোসনা’ সিনেমাটি দেখেছি। এখানে সিনেমা দেখতে টিকিট লাগে না। বিষয়টি দারুণ। আরও প্রচার প্রচারণা থাকলে এখানে দর্শক বাড়বে বলে মনে করি।’

সিনেমা শেষে দর্শকদের মুখে তৃপ্তির হাসি। কেউ স্মৃতিচারণে ব্যস্ত, কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে পর্দার। ৬৫ বছরের দর্শক রোকসানা বেগম বললেন, “এই সিনেমা মুক্তির সময় আমি কলেজে পড়তাম। আজ আবার দেখলাম, মনে হলো সময় থেমে গেছে। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের এই উদ্যোগ কেবল বিনোদন নয়, এটি যেন এক নীরব পাঠশালা যেখানে পুরোনো সিনেমা হয়ে উঠছে ইতিহাস শেখার জানালা, আর প্রজন্মের পর প্রজন্মকে ফিরিয়ে নিচ্ছে সিনেমার সোনালি যুগে।”

ফিল্ম আর্কাইভের প্রজেকশনিস্ট আব্দুর রহমান বলেন, ‘সিনেমার ওপর নির্ভর করে প্রজেকশন হলে দর্শক আসছেন। প্রয়াত নায়ক সালমান শাহ’র সিনেমা চালালে দর্শক হাউসফুল হয়ে যায়। অনেক সময় আমরা হলে বসার জায়গাও দিতে পারি না। ঢাকার বাইরে থেকে দর্শকরা চলে আসেন। পরিবারের সব সদস্যরাও সিনেমা দেখতে আসেন এখানে।’

দেশ স্বাধীনের পর সত্তর দশকের মাঝামাঝি বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের ফিল্ম আর্কাইভ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে চলচ্চিত্র সংসদের সহযোগিতায় তদানীন্তন তথ্য ও বেতার মন্ত্রণালয় প্রথম ফিল্ম আর্কাইভের রূপরেখা তৈরি করে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ১৭ মে ‘বাংলাদেশ ফিল্ম ইনস্টিটিউট অ্যান্ড আর্কাইভ’ প্রতিষ্ঠা লাভ করে। ১৯৮৪ সালে এটিকে বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ নামকরণ করা হয়। শুরু থেকেই বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়াধীন চলচ্চিত্রে সংশ্লিষ্ট একটি ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করে আসছে। প্রতিষ্ঠালগ্নে ভাড়া বাড়িতে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হয়। পর্যায়ক্রমে ধানমন্ডি, কলেজ গেট, গণভবন ও সর্বশেষ  শাহবাগে [জাতীয় সম্প্রচার ভবনের তৃতীয় তলায়] পরিচালিত হয়। এরপর ২০১৭ সালে আগারগাঁওয়ে নির্মিত হয় ফিল্ম আর্কাইভ ভবন। নতুন ভবনে দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হয় ২০১৮ সালের শেষের দিকে। ভবনটি প্রতিষ্ঠার পরপরই এখানে নিয়মিত সিনেমা প্রদর্শনী হয়ে আসছে।

ফিল্ম আর্কাইভে রয়েছে ৩০০ আসনের একটি প্রজেকশন হল। এ হলটিতে প্রতি বৃহস্পতিবার সিনেমা দেখানো হয়। পাশাপাশি রয়েছে ৫০০ আসনের মাল্টিপারপাস অডিটোরিয়াম। এ হলটিতে মাঝেমধ্যে প্রদর্শিত হয় সিনেমা। 

বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভের পরিচালক ফারহানা রহমান জানালেন, “আমরা চাই তরুণ প্রজন্ম জানুক বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস। তাই নিয়মিত ক্ল্যাসিক চলচ্চিত্র বিনামূল্যে প্রদর্শনের উদ্যোগ নিয়েছি। ১৯৭৮ সাল থেকে সীমিত আকারে সিনেমা প্রদর্শনী হয়ে আসছিল। ফিল্ম আর্কাইভের নতুন ভবন প্রতিষ্ঠার পর থেকেই নিয়মিত দর্শক এখানে সিনেমা দেখছেন। পুরোনো ও নতুন সিনেমাগুলো প্রদর্শিত হচ্ছে। যেসব সিনেমা আমাদের কাছে জমা পড়ে, সেসব সিনেমাই এখন দেখাচ্ছি। আমার যখন সামাজিক মাধ্যমে সিনেমাগুলো নিয়ে কোন পোস্ট দিই, তখন দর্শক তাদের পছন্দের সিনেমাগুলো নিয়ে কথা বলেন। দর্শক রিভিউর ওপর কিছু সিনেমা প্রদর্শনীতে যায়। দর্শকের বেশ সাড়া পাচ্ছি। ক্রমেই দর্শক বাড়ছে।”

আরও পড়ুন