টিএনএন ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:৫৩, ৩০ জানুয়ারি ২০২৬
ছবি: সংগৃহীত
সংসদ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে নির্বাচনী সহিংসতার ঘটনা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রার্থীদের সমর্থকদের মধ্যে পাল্টাপাল্টি হামলা ও সংঘর্ষে ভোটের পরিবেশ ক্রমেই উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। এতে সাধারণ ভোটার ও প্রার্থীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে শান্তিপূর্ণ ও নির্বিঘ্ন পরিবেশ থাকবে কি না এ নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। নির্বাচনী জনসভা ও প্রচারণায় একে অন্যের বিরুদ্ধে অভিযোগের ভাষা ক্রমেই তীব্র হচ্ছে, যা অনেক ক্ষেত্রে রূপ নিচ্ছে সহিংসতায়।
আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব অনুযায়ী, প্রার্থীদের প্রচারণা শুরুর পর ২২ থেকে ২৯ জানুয়ারি—এই আট দিনে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে অন্তত ৪২টি। এসব ঘটনায় চারজন নিহত এবং ৩৫৩ জন আহত হয়েছেন। আর ১ থেকে ২৯ জানুয়ারি পর্যন্ত পুরো জানুয়ারিতে দেশের বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে ৬৫টি। এতে প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ১০ জন এবং আহত হয়েছেন ৫৫৫ জন।
সর্বশেষ গত বুধবার শেরপুরে প্রার্থীদের নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ অনুষ্ঠানে চেয়ারে বসা নিয়ে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এতে জামায়াতে ইসলামীর শ্রীবরদী উপজেলা সেক্রেটারি রেজাউল করিম নিহত হন। তিনি শ্রীবরদীর ফতেহপুর ফাজিল মাদ্রাসার প্রভাষক ছিলেন। তপশিল অনুযায়ী, ২২ জানুয়ারি থেকে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে, যা ভোট গ্রহণের ৪৮ ঘণ্টা আগ পর্যন্ত চলবে।
এ বিষয়ে গতকাল রাতে পুলিশ মহাপরিদর্শক বাহারুল আলম বলেন, নির্বাচন ও গণভোট সম্পন্ন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। ভোট আয়োজনের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। তাঁর মতে, দু-চারটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নির্বাচন সম্পন্ন করার পথে বড় কোনো বাধা নয়। বাংলাদেশে প্রতিটি নির্বাচনে কমবেশি সংঘর্ষ হয়ে থাকে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তবে মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির বলেন, নির্বাচনী প্রচারণাকে ঘিরে যে সহিংসতা দেখা যাচ্ছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, মাত্র আট দিনে ৪২টি সংঘর্ষে চারজন নিহত এবং সাড়ে তিন শতাধিক মানুষ আহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে নির্বাচনী পরিবেশ এখনো নিরাপদ ও সহনশীল হয়ে ওঠেনি। নিহতদের মধ্যে একজন নারী রয়েছেন, যিনি রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত না থেকেও সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এটিকে তিনি দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির পুরোনো ও দুঃখজনক চিত্র হিসেবে উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর আরও দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা প্রয়োজন। শেরপুরের ঝিনাইগাতীর ঘটনাটি প্রশাসনিক সক্ষমতা ও প্রতিরোধ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা তুলে ধরেছে। নির্বাচন যত এগিয়ে আসছে, জনমনে অস্বস্তিও তত বাড়ছে। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি রাজনৈতিক দলগুলোরও বড় ভূমিকা রয়েছে। দলীয় নেতৃত্বকে স্পষ্টভাবে সহিংসতার বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হবে এবং নেতাকর্মীদের সংযম ও ধৈর্যের বার্তা দিতে হবে। তাঁর মতে, নির্বাচন গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করার একটি প্রক্রিয়া; সেই প্রক্রিয়া রক্তাক্ত ও বিতর্কিত হলে পুরো রাষ্ট্রই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
পুলিশ সদরদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, তপশিল ঘোষণার পর ১২ ডিসেম্বর থেকে ২৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন ঘিরে সারাদেশে মোট ২০০টি সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে প্রার্থীর ওপর হামলা ৯টি, প্রতিদ্বন্দ্বী সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ ৭৩টি, অবৈধ অস্ত্রের ব্যবহার ২টি, হুমকি ও ভীতি প্রদর্শন ৮টি, প্রচারণায় বাধা ২২টি, নির্বাচন–সংশ্লিষ্ট অফিস ও প্রতিষ্ঠানে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ ১৪টি, আক্রমণাত্মক আচরণ ১৫টি, রাজনৈতিক হত্যা ৪টি, সংখ্যালঘুর ওপর হামলা ১টি, অবরোধ ও বিক্ষোভ ১১টি এবং অন্যান্য কারণে সংঘর্ষের ঘটনা ৪২টি।
আসকের তথ্যমতে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে রাজনৈতিক সহিংসতা ধারাবাহিক রূপ নিয়েছে, যা ২০২৫ সালে আরও বিস্তৃত ও তীব্র হয়েছে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে অন্তত ৪০১টি রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় ১০২ জন নিহত এবং চার হাজার ৭৪৪ জন আহত হয়েছেন।
আসকের বিশ্লেষণে দেখা যায়, এ সময়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে অন্তত ৩৫টি সংঘর্ষে ৪৫৪ জন আহত এবং ১০ জন নিহত হয়েছেন। বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে ৩৩টি সংঘর্ষে ৫২০ জন আহত এবং তিনজন নিহত হন। বিএনপি ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মধ্যে চারটি সংঘর্ষে শতাধিক ব্যক্তি আহত হয়েছেন। বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে ১৯২টি সংঘর্ষে ৩৯ জন নিহত এবং কমপক্ষে দুই হাজার ৩৮০ জন আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ২০২৫ সালে দুর্বৃত্তদের হামলা, নির্যাতন ও গুলিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অন্তত ১১১ জন নেতাকর্মী নিহত হয়েছেন।
নির্বাচন ঘিরে সহিংসতায় প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে একের পর এক। বুধবার বিকেলে শেরপুর-৩ (শ্রীবরদী–ঝিনাইগাতী) আসনে বিএনপি ও জামায়াতের নেতাকর্মীদের সংঘর্ষে জামায়াত নেতা রেজাউল করিম নিহত হন। এর আগে ১৬ জানুয়ারি ময়মনসিংহের ধোবাউড়ায় বিএনপি ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের সংঘর্ষে নজরুল ইসলাম নামে এক কর্মী নিহত হন। ২১ জানুয়ারি নাটোরের সিংড়ায় জিয়া পরিষদের সদস্য মো. রেজাউল করিমকে গলা কেটে হত্যার ঘটনার জেরে অগ্নিসংযোগে ছাবিহা বেগম (৭২) নামের এক নারী দগ্ধ হয়ে মারা যান।
এ ছাড়া কেরানীগঞ্জে গুলিবিদ্ধ হয়ে ২৪ জানুয়ারি বিএনপি নেতা হাসান মোল্লা মারা যান। গত ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর পল্টনে গুলিবিদ্ধ ইনকিলাব মঞ্চের আহ্বায়ক শরিফ ওসমান হাদিও চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান।
নির্বাচনী প্রচারণা ঘিরে হামলা ও সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। কিশোরগঞ্জ, মেহেরপুর, পটুয়াখালী, সিরাজগঞ্জ ও নওগাঁসহ বিভিন্ন জেলায় বিএনপি, জামায়াত ও অন্যান্য দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে একাধিক সংঘর্ষে বহু মানুষ আহত হয়েছেন, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনাও ঘটেছে।
ক্রমবর্ধমান এই সহিংসতা নির্বাচনী পরিবেশ ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে বলছেন সংশ্লিষ্টরা।
/এআর