প্রতিবন্ধী সন্তানকে নিয়ে জীবনযুদ্ধ

‘আমার ছাওলডা বোঝা না, এইডাই আমার শক্তি’

টিএনএন ডেস্ক

প্রকাশ: ২০:০১, ৭ জানুয়ারি ২০২৬

‘আমার ছাওলডা বোঝা না, এইডাই আমার শক্তি’

আড়পাঙ্গাসিয়া নদীর তীরে বাবা আলাউল ইসলাম নৌকার পাটাতন ঠিক করছেন। পাশের আরেকটি নৌকায় বসে আছে শিশু সিয়াম। সংগৃহীত

 

প্রতিবন্ধী সন্তানকে বুকে আগলে রেখে প্রতিদিন জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন খুলনার কয়রা উপজেলার আলাউল ইসলাম। সীমিত সামর্থ্য, প্রতিকূল প্রকৃতি আর শারীরিক প্রতিবন্ধকতা—সবকিছুর মধ্যেও তিনি লড়ছেন একটাই স্বপ্ন নিয়ে, যেন তাঁর সন্তান সিয়াম হোসেনকে কোনোদিন কারও কাছে হাত পাততে না হয়।   প্রতিবন্ধী সন্তানকে বোঝা নয়, জীবনের শক্তি হিসেবে দেখেই প্রতিদিন সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন খুলনার কয়রা উপজেলার আলাউল ইসলাম।

খুলনার কয়রা উপজেলার সর্বদক্ষিণ প্রান্তের গ্রাম গোলখালী। গ্রামের শেষ প্রান্ত পেরোলেই আড়পাঙ্গাসিয়া নদী, তার ওপারেই সুন্দরবনের বিস্তীর্ণ অরণ্য। নদী, বন আর বেড়িবাঁধের মাঝখানেই চলে এখানকার মানুষের জীবনসংগ্রাম।

পৌষের এক দুপুরে, ১ জানুয়ারি। আড়পাঙ্গাসিয়া নদীর তীরের বেড়িবাঁধ ধরে হাঁটতে হাঁটতে নজরে পড়ে নদীর চরে রাখা একটি নৌকা। নৌকার ওপর বসে আছে সাত বছরের শিশু সিয়াম হোসেন। কাছ থেকে তাকাতেই বোঝা যায়—তার দুই হাতের কনুইয়ের নিচের অংশ নেই। একটি পায়ের পাতা ঊরুর সঙ্গে যুক্ত। তবু নৌকার ওপর সে বসে আছে নির্ভার ভঙ্গিতে।

পাশের আরেকটি নৌকার পাটাতন ঠিক করছিলেন সিয়ামের বাবা আলাউল ইসলাম। কাজ থামিয়ে তিনি বলেন, ‘জন্ম থেইকাই ছাওলডা এমন। হাঁটতে পারে না, দুই হাতও নাই। জন্ম থেইকা এইরম হওয়ায় চিকিৎসাও নাই। বাবা হইয়া এইডা মাইনে নেওয়া ছাড়া আমার আর কী করার আছে? তবু ছাওলডার মুখে “আব্বা” ডাক শুনলেই সব কষ্ট ভুলে যাই।’

সিয়াম স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করতে পারে না। এক পায়ে ভর দিয়ে মাটিতে বসে শরীর ঠেলে ঠেলে চলে। তবু সে নিয়মিত যায় স্থানীয় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বাবার ভাষায়, ‘আমার ছাওলডার ব্রেনডা খুব ভালো। একবার পড়া শুনলেই মুখস্থ হইয়া যায়। আল্লাহ হাত-পা ভালো না দিলেও মেধা ভালো দিছে।’

বাবা নৌকা সারালে সিয়াম পাশে বসে মন দিয়ে তাকিয়ে থাকে। আজও সে একাই বাড়ি থেকে নদীর চরে এসেছে। বুক আর হাতের ওপরের অংশে ভর করেই নৌকায় উঠেছে, আবার একাই নামতেও পারবে।

আলাউল ইসলামের জীবিকা সুন্দরবননির্ভর। কখনো মাছ ধরেন, কখনো কাঁকড়া শিকার করেন। নৌকা ও জাল তাঁর নিজের। বেড়িবাঁধের পাশে সামান্য জমির ওপর তাঁর ঘর। এইটুকুই সম্বল। তবু তাঁর কণ্ঠে নেই কোনো আক্ষেপ। তিনি বলেন, ‘আমি চাই না কেউ আমার ছাওলডাকে দেইখে করুণা করুক। সাহায্যের নামে কিছু দিতে চাইলে সেটাও নেব না।’

কথা বলতে বলতে হঠাৎ থেমে যান তিনি। সিয়ামের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘ছাওলডা ঘরে আইসা কয়—মা, ভাত খাব; আব্বা, গোসল করব। এই ডাকই আমাগের সব কষ্ট ভুইলা দেয়। আল্লাহর কাছে একটাই চাই—আমার শরীলডা যেন ভালো রাখে। গায়ে খাইটে এমন কিছু করতি পারি, যেন ভবিষ্যতে ছাওলডাকে কারও কাছে হাত পাততে না হয়।’

এই সময় আড়পাঙ্গাসিয়া নদীতে জোয়ারের পানি বাড়তে থাকে। নৌকার ওপর বসে সিয়াম বাবার দিকেই তাকিয়ে থাকে। তার চোখে কোনো অভিযোগ নেই। পাশে আছে এমন একজন বাবা, যাঁর কাছে প্রতিবন্ধকতা কোনো বোঝা নয়—বরং সন্তানই তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি।

/এআর

আরও পড়ুন