মংক্যএ মার্মা, কুবি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০:২৬, ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
আঞ্জুমান আরা (বামে উপরে), ইয়াসির আরাফাত (বামে নিচে), রায়হান (উপরে ডানে), রেমি চাকমা (ডানে নিচে)
দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে সূচিত সংস্কার প্রক্রিয়ার ধারাবাহিকতায় গত ১২ ফেব্রুয়ারি (বৃহস্পতিবার) অনুষ্ঠিত হয়েছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন।
নানা রাজনৈতিক টানাপোড়েন ও পরিবর্তনের প্রত্যাশার প্রেক্ষাপটে আয়োজিত এই নির্বাচন ঘিরে সারাদেশে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ও শিক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা গেছে ব্যাপক আগ্রহ ও সক্রিয় অংশগ্রহণ।
ফলাফল ঘোষণার পর নতুন সরকার গঠনের মাধ্যমে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে সূচিত হয়েছে নতুন অধ্যায়। এ সময়ে শিক্ষার্থীদের মনে যেমন নতুন দিনের স্বপ্ন ও উচ্ছ্বাস, তেমনি রয়েছে শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সুশাসন ও বৈষম্যহীন সমাজ গঠনের প্রত্যাশা। নবনির্বাচিত সরকার ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে তারা কেমন বাংলাদেশ চান-এ বিষয়ে মন্তব্য নিয়েছেন মংক্যএ মার্মা।
সুশাসন, সমতা ও দক্ষ তরুণশক্তির পথেই টেকসই বাংলাদেশ: আঞ্জুমান আরা
আমি মনে করি, নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার—বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচার—নিশ্চিত করা।
সাম্প্রতিক সময়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-এর জাতীয় নির্বাচন গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতা বজায় রাখার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে দেখা যায়। একজন শিক্ষার্থী ও সচেতন নাগরিক হিসেবে আমি মনে করি, নতুন সরকারের প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, আইনের শাসন এবং নাগরিকদের মৌলিক সাংবিধানিক অধিকার—বিশেষ করে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সমতা ও ন্যায়বিচার—নিশ্চিত করা। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা জনআস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
একই সঙ্গে বৈষম্য দূরীকরণ, সংখ্যালঘু ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানে সমান সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষাব্যবস্থায় দক্ষতা, গবেষণা, সৃজনশীলতা ও ডিজিটাল সক্ষমতা বাড়িয়ে তরুণ প্রজন্মকে দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করা সময়ের দাবি। সর্বোপরি, অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন ও যুবসমাজের ক্ষমতায়নের মাধ্যমে দেশের টেকসই অগ্রগতি নিশ্চিত করা সম্ভব বলে আমি বিশ্বাস করি।
আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও সমঅধিকারের দাবি: রেমী চাকমা
পার্বত্য ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির মালিকানা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, নিজস্ব সংস্কৃতি, পোশাক, উৎসব ও প্রথা চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
একজন আদিবাসী শিক্ষার্থী হিসেবে নবনির্বাচিত সরকারের কাছে আমার প্রধান প্রত্যাশা হলো সংখ্যালঘু আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি ও ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা। সংবিধানে “আদিবাসী” হিসেবে স্পষ্ট স্বীকৃতি প্রদান করলে তাদের ভাষা, সংস্কৃতি, ভূমি ও স্বতন্ত্র পরিচয় সুরক্ষায় রাষ্ট্রীয় দায়বদ্ধতা আরও সুদৃঢ় হবে।
পার্বত্য ও সমতলের আদিবাসীদের ঐতিহ্যগত ভূমির মালিকানা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর আইন ও বাস্তবায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা, নিজস্ব সংস্কৃতি, পোশাক, উৎসব ও প্রথা চর্চার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি এবং স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানে সমঅধিকার প্রতিষ্ঠা করা জরুরি।
আমরা বৈষম্য নয়, সমান মর্যাদা ও ন্যায়ভিত্তিক উন্নয়ন চাই। নতুন বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি, মানবাধিকার সুরক্ষা এবং উন্নয়নের মূলধারায় সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত সরকারের।
জুলাইয়ের আত্মত্যাগ ও নতুন সরকারের প্রতি প্রত্যাশা: ইয়াসির আরাফাত
আমরা চাই, ড. ইউনুস এর নেতৃত্বে গঠিত অন্তরবর্তীকালনী সরকারে শাসনামলে আমরা যেসব স্বাধীনতা পেয়েছি, সেসব এই সরকার অক্ষুণ্ণ রাখবে। শহিদ শরিফ উসমান হাদীসহ আমাদের হাজারো শহিদের একটি ইনসাফে বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে আকাঙ্ক্ষা তা এই সরকার জুলাই সনদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পালন করুক।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীহ হওয়া হাজারো দেশপ্রেমিকের তাজা খুনের বিনিময়ে আমরা নতুনভাবে যে স্বাধীনতা পেয়েছি এবং পরবর্তীতে গণতান্ত্রিক পক্রিয়ায় যে নতুন সরকার গঠন করতে পেরেছি; স্বাভাবিকভাবেই সে সরকারের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা অঢেল। আমরা চাই, ড. ইউনুস এর নেতৃত্বে গঠিত অন্তরবর্তীকালনী সরকারে শাসনামলে আমরা যেসব স্বাধীনতা পেয়েছি, সেসব এই সরকার অক্ষুণ্ণ রাখবে। শহিদ শরিফ উসমান হাদীসহ আমাদের হাজারো শহিদের একটি ইনসাফে বাংলাদেশ বিনির্মাণের যে আকাঙ্ক্ষা তা এই সরকার জুলাই সনদের পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়নের মাধ্যমে পালন করুক। সর্বোপরি দীর্ঘ আওয়ামী ফ্যাসিবাদী আমলের সকল ব্যর্থতাকে অতিক্রম করে এই সরকার বাংলাদেশকে এগিয়ে নিয়ে যাক। বাস্তবিকঅর্থেই গড়ে তুলুক একটি স্বাধীন, সার্বভৌম ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ ।
শিক্ষা ব্যবস্থা আধুনিক ও গবেষণামুখী হোক: আহম্মেদ হোসেন রায়হান
আমরা তরুণরা চাই- শিক্ষা ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও গবেষণামুখী হোক, বেকারত্ব কমুক, এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হোক।
নির্বাচন পরবর্তী সময়ে একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে আমার মনে একসাথে আশা, উদ্বেগ এবং দায়িত্ববোধ কাজ করছে। নির্বাচন মানে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশ নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত। আমরা তরুণরা চাই- শিক্ষা ব্যবস্থা আরও আধুনিক ও গবেষণামুখী হোক, বেকারত্ব কমুক, এবং যোগ্যতার ভিত্তিতে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হোক। কিন্তু একই সাথে রাজনৈতিক অস্থিরতা, সহিংসতা বা বিভাজন যেন আমাদের ক্যাম্পাস ও সমাজকে প্রভাবিত না করে—এটা নিয়েও দুশ্চিন্তা থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী হিসেবে আমরা চাই একটি নিরাপদ, মুক্ত ও সহনশীল পরিবেশ, যেখানে ভিন্ন মত প্রকাশ করা যাবে ভয় ছাড়াই। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ দেখতে চাই যেখানে গণতন্ত্র শুধু নির্বাচনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং ন্যায়বিচার, সমতা এবং উন্নয়নের মাধ্যমে বাস্তবে প্রতিফলিত হবে। তাই এখন সময় দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে সচেতন থাকা, গঠনমূলক সমালোচনা করা এবং দেশের ইতিবাচক পরিবর্তনে নিজেদের প্রস্তুত করা।
/এআর